স্বপ্নের পেছনে দেড়শ বছর ধরে ছুটছে স্বপনরা


প্রকাশিত: ১০:২৪ এএম, ২৫ মে ২০১৬

দিন বদলের পরিক্রমায় অর্থনীতির চাকা সচল হলেও বদলেনি স্বপনদের ভাগ্য। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জীবন ধারণের ব্যয় ও সীমাহীন কষ্ট। দিনের পর দিন মানবেতর জীবন-যাপন করে চলছেন স্বপনরা। সময়ের বিবর্তনে যেখানে মানুষ ছুটে চলেছেন আধুনিক বিজ্ঞানের পেছনে, সেখানে স্বপনদের মুখে দুই বেলা অন্য জোটাটা দায়।

ব্রিটিশ আমলের ভূমিদাসের মতোই চা মালিকের বাগানের সঙ্গে বাধা স্বপনের মতো হাজারো চা শ্রমিকের নিয়তি। আর চা শিল্পের উন্নয়ন হলেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না স্বপনদের। চা-শ্রমিকের পাঁজরের চিকন হাড়কে পেরেক হিসেবে কাঠের বাক্সে গেঁথে চা-পাতা ভরা হয়। আর সে চায়ের কাপে লেপ্টে থাকে সংখ্যালঘু নারী শ্রমিকদের রক্ত, ঘাম আর নাকের পানি-চোখের পানি।

shopon-Hobigonj

জন্মের পর থেকেই লেখাপড়ার পরিবর্তে চা বাগানের সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের দেউন্দি বাগানের শ্রমিক স্বপন লাল মালের (৩০)। প্রায় ১৫০ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় কাজ করছেন তিনি। বাবা মিঠাই লালও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। অনেক ছোট বেলায় বাবাকে এবং গতবছর মাকেও হারিয়েছেন স্বপন।

তাদের কথা কেউ মনে রাখে না জানিয়ে স্বপন লাল বলেন, মালিক পক্ষ দৈনিক মজুরি দেন মাত্র ৮৫ টাকা, সেই সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে খাবার অনুপযোগী তিন কেজি আটা দেন। পাশাপাশি নামমাত্র চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন। আর ৮ ঘণ্টা কাজ করার কথা থাকলেও সময়ের ধরা বাধা কোনো নিয়ম মানা হয় না।

এক পর্যায়ে স্বপন লাল বলেন, কি লাভ এসব শুনে। দুঃখ-দুর্দশা নিয়ে আমরা বাগানে কাজ করে যাচ্ছি। সর্বদা বাগানের কথাই ভাবতে হয়, সন্তানদের কথা ভাবারও সময় হয় না।

সরেজমিনে দেখা যায়, একপেচে করে সিল্কের শাড়ি পরে পিছনে ঝুঁড়ি বেঁধে নারী শ্রমিকরা দুটি কুঁড়ি ছিঁড়ে নিচ্ছে। আর অদ্ভুত কায়দায় সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। এক পায়ে দাঁড়িয়ে, মাইলের পর মাইল হেঁটে কচি পাতা সংগ্রহ করে চলেছেন তারা।

shopon-Hobigonj

চা শ্রমিকরা জানান, ২৩ কেজি পাতা তুললেই কেবল দিনের নিরিখ পূরণ হয়, হাজিরা হিসেবে গণ্য হয়। দিনে অন্তত ২০০টি গাছ ছাঁটতে হয়। এক একর জমিতে কিটনাশক ছিঁটালে তবে নিরিখ পূরণ। মরিচ আর চা পাতার চাটনি, সঙ্গে মাঝে মাঝে মুড়ি, চানাচুর তাদের দৈনন্দিন খাবার। তবে আগে সেখানে তাদের ৪৫ টাকা দিন ভাতা দেয়া হতো, এখন সেখানে ৮৫ টাকা দেয়া হয়। এছাড়া রেশন এবং চিকিৎসা সেবা আগের তুলনায় অনেকটা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে সেটা খুবই সামান্য। এসময় তারা বেতন ভাতা বাড়ানোর দাবি জানান।

বাগান কর্তৃপক্ষের একজনের সঙ্গে কথা বললে তিনি প্রথমেই শর্ত দেন নাম প্রকাশ করা যাবে না। সেই শর্তে রাজি হলে তিনি জানান, শ্রমিকদের বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেতন ভাতাও বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া শ্রমিকদের জীবন মান চিন্তা করে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের।

shopon-Hobigonj

স্বপনদের মতো অসংখ্য চা শ্রমিকের প্রতি সদয় আচরণ ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা একান্ত জরুরি। আর যাদের শ্রমে অর্জিত হচ্ছে হাজার কোটি বৈদশিক মুদ্রা, তাদের অবহেলিত না রেখে অধিকার বাস্তবায়ন করা হোক এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের।

এমএএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।