যশোরে ট্রেন দুর্ঘটনা : কাঁদছে কেশবপুরের মানুষ
যশোরের মানিকদিহি জামতলা রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ও প্রাইভেটকারের সংঘর্ষে নিহত পাঁচজনের মধ্যে চারজনের বাড়ি কেশবপুরে হওয়ায় গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। নিহতদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। সমবেদনা জানাতে এলাকার শত শত মানুষ ভিড় করছে নিহতদের বাড়ি। সকলেই অশ্রুসিক্ত।
কেশবপুরের নিহত চারজন হলেন- কেশবপুরের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সমতা ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও পাচারইল গ্রামের আবদুল কাদেরের ছেলে রেজাউল করিম রাজু (৩০) ও তার গাড়িচালক বাইশা গ্রামের আব্দুল হাকিম (৩২) এবং একই উপজেলার খতিয়াখালী গ্রামের জয়া রাণী দাস (৫৫) ও তার নাতি সুব্রত দাসের ছেলে বাঁধন দাস (১৮)।
কেশবপুরের মঙ্গলকোট ইউনিয়নের পাচারই গ্রামের সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সচিব মৃত আব্দুল কাদেরের একমাত্র ছেলে রেজাউল করিম রাজু। তিনি কেশবপুর শহরের সমতা ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন সমাজসেবা করার। তাই মাত্র ২৮ বছর বয়সেই এনজিও প্রতিষ্ঠার পর কঠোর পরিশ্রম করে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক লেনদেনের স্বীকৃতি পান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিল পেয়ে প্রায় ১০০ বেকার নারী-পুরুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকায় ওই প্রাইভেটকারেই তিনি যশোরের পথে রওনা দেন। সংসারের একমাত্র আয়ক্ষম ছেলেকে হারিয়ে রাজুর মা পাগলপ্রায়। দুই ভাই বোনোর মৃত্যু শোকে বারবার মূর্চ্ছা যাচ্ছেন।
মাত্র আঠারো দিন আগে (৫ জুন) বিয়ে করে সুখের সংসার পেতেছিলেন প্রাইভেটকারের চালক কেশবপুরের বায়সা গ্রামের শামছুর রহমানের ছেলে আব্দুল হাকিম। কেশবপুর শহর থেকে ২ কিলোমিটার দূরে বায়সা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সদ্য বিবাহিত নববধূ ফাহিমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না, চোখ দিয়ে অঝরে জল ঝরছে।
হাকিমের মা ছালমা বেগম চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, বের হতে বিলম্ব হওয়ায় মোবাইল ফোনে গাড়ির মালিক এনজিও পরিচালক রেজাউল করিম তাড়া দিলে সকালে তার আদরের মানিক হাকিম বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। ৫ ভাই বোনের মধ্যে সবার প্রিয় ছোট সন্তান আব্দুল হাকিমের মৃত্যুতে বিলাপ করছেন তার বাবা শামছুর রহমান।
নিহত কেশবপুর মধুশিক্ষা নিকেতন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী বাঁধন দাস ও তার দাদি (দিদা) জয়া রাণী দাসের বাড়ি কেশবপুর শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে খতিয়াখালী গ্রামে। তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় ওই গ্রাম ও আশপাশের গ্রামের শত শত মানুষ পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে এসেছে। কিন্তু সদ্য সন্তান হারানো বাঁধনের মা বাসন্তি রাণী দাসের আর্তনাদ গোটা পরিবেশকে শোকে মূহ্যমান করে তুলেছে।
নিহত জয়া রাণী দাসের দেবর মাস্টার রণজিৎ কুমার দাস জানান, তার ভাইজি দুর্ঘটনায় আহত দীপিকা রাণী দাস ও তার ছেলে নিহত চয়ন দাস বুধবার বিকেলে যশোরের সদর উপজেলার তীরেরহাট থেকে তাদের বাড়ি বেড়াতে এসেছিল।
বৃহস্পতিবার দীপিকা তার ছেলে চয়ন, মা জয়ারাণী ও ভাইয়ের ছেলে বাঁধনকে নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য সমতা ওয়ার্ল্ড এনজিওর ওই প্রাইভেটকারটি ভাড়া করে সকাল ৯টার দিকে রওনা হয়। কিন্তু দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে তিন পরিবারের এই চারজনের মৃত্যুতে গোটা উপজেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
মিলন রহমান/ এমএএস/পিআর