বাড়ছে শীত, কমছে কম্বল
হিমেল হাওয়ায় কাঁপছে বগুড়া। রাত নামলেই চরাঞ্চল, হাটবাজার, রেলস্টেশন আর ফুটপাতের নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষগুলো শীতের সঙ্গে লড়াই শুরু করে। এমন বাস্তবতায় এই জেলায় চলতি শীতে সরকারি ত্রাণ হিসেবে এসেছে ৭ হাজার ৫০০টি কম্বল ও ৭২ লাখ টাকা। কিন্তু প্রায় ৪০ লাখ মানুষের জেলায় এই বরাদ্দ কতটা বাস্তবসম্মত সেই প্রশ্নই এখন সবার মুখে মুখে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিল থেকে বগুড়া জেলার জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায় মিলিয়ে এসেছে মোট ৭ হাজার ৫০০টি কম্বল। এর মধ্যে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে ২ হাজার ৫০০টি কম্বল। বাকি ৫ হাজার কম্বল গেছে জেলার ১২টি উপজেলায়। এই হিসাবে প্রতিটি উপজেলার ইউনিয়নগুলো ভাগে পাচ্ছে গড়ে মাত্র ৪৫টি করে কম্বল।
এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি উপজেলায় ৬ লাখ টাকা করে মোট ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে স্থানীয়ভাবে কম্বল কিনে বিতরণের নির্দেশনা রয়েছে।

২০২৪ সালের শীতে বগুড়া জেলায় জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মাধ্যমে মোট ১২ হাজার ৮০০টি কম্বল বিতরণ করা হয়েছিল। সে সময় প্রতিটি ইউনিয়নে গড়ে ৭৫ থেকে ৮০টি কম্বল পৌঁছায়। অন্যদিকে এবছর শীতে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ইউনিয়নপ্রতি গড়ে ৪৫টিতে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বগুড়ায় ইউনিয়নপ্রতি কম্বল বরাদ্দ প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। গত বছর এই সংখ্যাতেও শীতার্ত মানুষের চাহিদা মেটেনি। এবার সেই তুলনায় বরাদ্দ কমে যাওয়ায় ভোগান্তির আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
বগুড়া জেলার একটি ইউনিয়নের গড় জনসংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ হাজার। এর মধ্যে বৃদ্ধ, দিনমজুর, ভিক্ষুক, ছিন্নমূল পরিবার ও শিশুদের ধরলে শীতার্ত মানুষের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যায় সহজেই।
শাজাহানপুর উপজেলার আমরুল ইউনিয়নের বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী রমজান আলী বলেন, শুনছি কম্বল এসেছে। কিন্তু ইউনিয়নে এত মানুষ, সেখানে কয়জনই বা পাবে? গত বছর নাম থাকলেও পাইনি। এবার কী হয় জানি না।
শহরের স্টেশন এলাকায় রাত কাটানো এক পথশিশু মোবারক জানায়, ‘শীততো এখনই। কম্বল যদি পরে দেয়, তাহলেতো কাজে লাগবে না। আমরা এখনো কোনো কম্বল পাইনি।’
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কম্বল বিতরণ করছে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এতে যুক্ত রয়েছেন। তবে নির্বাচনি মৌসুমে এই বিতরণ কার্যক্রম নিরপেক্ষ রাখার চেষ্টা করছে উপজেলা প্রশাসন- এমনটাই জানিয়েছেন সারিয়াকান্দির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমাইয়া ফেরদৌস।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ীই কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে। সবচেয়ে শীতার্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আচরণবিধি মেনেই সব কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন বলেন, এবার কম্বলের পাশাপাশি অর্থ বরাদ্দও দেওয়া হয়েছে, যাতে স্থানীয়ভাবে দ্রুত কম্বল কেনা যায়। মান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেই বিতরণ করা হবে। অনেক এলাকাতেই বিতরণ শুরু হয়েছে। এটা পর্যায়ক্রমে চলবে।

তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সংখ্যা কম হওয়ায় তালিকা তৈরির সময় চাপ ও অসন্তোষ এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
এক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ৪৫টা কম্বলে পুরো ইউনিয়নের শীতার্ত মানুষ সামলানো বাস্তবসম্মত না। অভিযোগ আসবেই।
গত শীতেও বগুড়ায় কম্বল বিতরণ নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছিল। কোথাও তালিকাভুক্ত হয়েও কম্বল পাননি শীতার্ত মানুষ, আবার কোথাও তুলনামূলক সচ্ছল পরিবার কম্বল পেয়েছে বলে অভিযোগ ছিল। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই এবারো সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় কাজ করছে। স্থানীয়ভাবে কম্বল কেনার ক্ষেত্রে টেন্ডার প্রক্রিয়া, অনুমোদন ও মান যাচাইয়ে সময় লাগছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে অনেক এলাকায় শীতের তীব্র সময় পার হলেও বিতরণ শুরু হয়নি।
ধুনট উপজেলার আমিরুন নামের এক বৃদ্ধা বলেন, নাম লিখেছে অনেক আগে। কিন্তু কবে দিবে কেউ জানে না। গত বছর তার নাম ইউনিয়ন পরিষদের তালিকায় থাকলেও বিতরণের দিন খবর পাননি। পরে জানতে পারেন, কম্বল শেষ। আবার এই উপজেলায় একটি পরিবার একাধিক কম্বল পেয়েছে সেই খবরও তিনি জেনেছেন।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, প্রায় ৪০ লাখ মানুষের জেলায় কয়েক হাজার কম্বল ও সীমিত অর্থ বরাদ্দ দিয়ে শীত মোকাবিলা কতটা বাস্তবসম্মত? গত বছর ইউনিয়ন প্রতি ৭৫-৮০টি কম্বল দিয়েও শীতার্ত মানুষের ভিড় সামলানো যায়নি। সেখানে এ বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৪৫-এ। শীতার্ত মানুষের কাছে কম্বল শুধু ত্রাণ নয়, এটি একটি রাত পার করার ভরসা। সেই ভরসাটুকু যদি অপ্রতুল হয়, দেরিতে পৌঁছায় বা সঠিক মানুষের হাতে না যায় তাহলে ত্রাণের উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এজন্য বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
এফএ/এএসএম