দুই সন্তান নিয়ে দিশাহারা স্ত্রী

মসজিদের মাইকে গরুচোর অপবাদ, ঘরে প্রাণ দিলেন যুবক

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নীলফামারী
প্রকাশিত: ০৮:৫৭ এএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২৬

নীলফামারীর সৈয়দপুরে এক যুবককে গরুচোর অপবাদ দিয়ে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। সকালে এমন মাইকিং শুনে রোকনুজ্জামান (২৭) নামে ওই যুবক মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে দুপুরে নিজ ঘর থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে এখন দিশাহারা পরিবার।

এদিকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা মামলা করার পাঁচদিন পেরিয়ে গেলও পুলিশ গ্রেফতার করেনি কাউকে। উল্টো ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা তুলে নিতে দেওয়া হচ্ছে হুমকি।

উপজেলার বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিণ সোনাখুলী গুয়াবাড়ী গ্রামে রোকনুজ্জামানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রী আবিয়া বেগম দরজায় বসে আহাজারি করছেন। বাবার শোকে মায়ের পাশে নির্বাক অবুঝ দুই শিশু ইমরান ও রোকাইয়া। বাবার আদর-যত্ন বোঝার আগেই ঝরে গেলো বাবা নামে বটবৃক্ষ। কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে লালন-পালন করবেন সন্তানদের এমন দুশ্চিন্তায় পড়েছেন আবিয়া বেগম। স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটেমাটি ছাড়া আর কোনো সম্পদও নেই তাদের।

এ ঘটনায় এলাকায় এখনও শোকের ছায়া। রোকনুজ্জামান পেশায় ফল ব্যবসায়ী ছিলেন। স্ত্রী, দুই সন্তান ও বাবা-মা নিয়ে ছিল তার সুখের সংসার।

স্থানীয়রা জানান, গত শুক্রবার বিকেলে রোকনুজ্জামানের বাড়ির পাশ থেকে আব্দুর রশীদ নামে এক ব্যক্তির একটি গরুচুরি হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে গরুটির সন্ধান পাওয়া যায়। গরু পাওয়ার পর রাতে রোকনুজ্জামানকে ডেকে এনে গরুচুরির অভিযোগ তুলে স্থানীয়ভাবে সালিশ বসানো হয়। তার আগে প্রায় তিন ঘণ্টা রোকনুজ্জামান ও তার বাবা জহুরুল হক বাট্টুকে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়। পরে এ সালিশে তাকে ২ হাজার ২০০ টাকা জরিমানা করা হয়। এসময় তার কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষরও নেন তারা। এরপর শনিবার সকালে গরুর মালিক আব্দুর রশীদ বাড়ির পাশে মসজিদের মাইকে রোকনুজ্জামানকে চোর বলে ঘোষণা দেন।

ঘোষণায় বলা হয়, ‘কারো গরু বা মুরগি চুরি হলে রোকনুজ্জামান ও তার পরিবারকে ধরলে পাওয়া যাবে। কারণ তারা চোর, গতকাল তারা গরুচুরি করে ধরা পড়েছে।’

এই ঘোষণা শোনার পর রোকনুজ্জামান লজ্জা ও অপমানে নিজ ঘরের তীরের সঙ্গে রশি পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। পরিবারের লোকজন টের পেয়ে দরজা ভেঙে তার মরদেহ দেখতে পায়। এসময় খবর দিলে মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায় পুলিশ।

ঘটনার পর রোকনুজ্জামানের বাবা জহিরুল ইসলাম রাতে থানায় আব্দুর রশিদ, তার ভাই মোহাম্মদ আলী, সেকেন্দার আলীসহ ৭ জনকে আসামি করে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করেন। তবে মামলার পাঁচদিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ বলছে আসামিরা পলাতক থাকায় কাউকে গ্রেফতার করা যাচ্ছে না।

আবিয়া বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি এ দুই সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, কী করবো, কিছুই বুঝতে পারছি না। ছোটো মেয়েটা এখনও তোলা দুধ খায়। টাকার অভাবে দুইদনি ধরে তাকে দুধ খাওয়াতে পারিনি। গত কয়দিন ধরে ছেলে-মেয়ে ও বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি কেউ ঠিকমতো খেতে দিতে পারিনি। কীভাবে আমাদের সংসার চলবে? কে আমাদের পাশে থাকবে?’

নিহতের চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, গরুর চুরির ঘটনায় তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। রোকনুজ্জামান কোনোভাবেই এটার সঙ্গে জড়িত নয়। তারপরও সালিশে বিষয়টি মীমাংসা হয়ে গিয়েছিল। সকালে কেন তার ও তার বাবাকে গরুচোর আখ্যা দিয়ে মাইকে ঘোষণা করা হলো? এটি আত্মহত্যা হলেও এর দায় তাদের নিতে হবে। অথচ মামলা করার পর তারাই উল্টো হুমকি দিচ্ছে।

রোকনুজ্জামানের প্রতিবেশী ফারুক হোসেন বলেন, মীমাংসার পরও মসজিদের মাইকে চোর বলা হয়। এ অপমান তিনি সহ্য করতে পারেননি। এ কারণে আত্মহত্যা করেছেন। পুলিশ যদি আসামি ধরত তাহলেও তাদের মনে একটু সান্ত্বনা থাকতো।

সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম রেজা জাগো নিউজকে বলেন, এ ঘটনায় ছেলের বাবা বাদী হয়ে থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনায় মামলা করেছেন। আসামিদের গ্রেফতার অভিযান চলমান আছে।

আমিরুল হক/এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।