মৌসুমের শুরুতে আলুর দামে ধ্বস, লোকসানের আশঙ্কায় চাষিরা
চলতি মৌসুমের শুরুতেই আলুর দামে বড় ধরনের ধ্বস নেমেছে। মাঠ থেকে ওঠা নতুন আলু বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তুলতে পারছেন না কৃষকরা। ন্যায্য দাম না পেয়ে গতবারের মতো এবছরও বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।
কৃষকরা বলছেন, বাজারে গতবছরের অবিক্রিত আলু এখনও থেকে যাওয়া, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও আলু সংরক্ষণের সুবিধা না থাকায় পাইকারি বাজারে আলুর দাম কমে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ১ কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৭ লাখ টন উৎপাদন হয়েছিল রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে শুধু এই দুই বিভাগেই ৩ লাখ ৪৩ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৮৪ লাখ টন আলু উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর ও পাবনাসহ প্রধান উৎপাদনকারী জেলার কৃষকেরা জানান, বীজ, সার, সেচ, শ্রম ও পরিবহন ব্যয় গতবছরের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ায় চলতি মৌসুমে উৎপাদন খরচ পড়েছে কেজি প্রতি ১৮ থেকে ২২ টাকা। তবে বর্তমানে পাইকারি বাজারে নতুন আলু প্রতি কেজি ১৫ থেকে ১৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে তাদের উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার আলুচাষি লুৎফর রহমান জানান, গত মৌসুমে আলু চাষ করে ব্যাপক লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। সে ক্ষতিকে পুষিয়ে নেওয়ার আশায় এবারও আলু চাষ করেছেন তিনি। কিন্তু গতবছরের মতো এবারও উৎপাদন খরচই তুলতে না পেরে পথে বসার অবস্থা তার।
বাগমারা উপজেলার আরেক কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, আলুর ভরা মৌসুম আসতে এখনও মাস খানেক দেরি। মূলত বেশি দাম পাওয়ার আশায় কৃষক এই আগাম আলু চাষ করে থাকেন। কিন্তু গতবছরের আলু এখন বাজারে থেকে যাওয়ায় নতুন আলুর চাহিদা কমে গেছে। ফলে দাম পড়ে গেছে।
তিনি আশঙ্কা করে বলেন, পুরোদমে আলু বাজারে আসলে দাম আরও কমে যেতে পারে।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলা সদরের কৃষক দুলাল মিয়া জানান, তিনি ১৮ বিঘা জমিতে এবার কার্ডিনাল আলু চাষ করেছেন। প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে ২২ টাকা। অথচ বাজারে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ১৫-১৮ টাকা কেজি।
এদিকে আগাম জাতের পেঁয়াজ (মুড়িকাটা) চাষিরাও একই ধরনের সংকটে পড়েছেন। বর্তমানে কৃষকেরা প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি করছেন ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচ পড়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা।
পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার পেঁয়াজচাষি রবিুল ইসলাম বলেন, ঘরে রেখে দিলে পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই কম দাম হলেও বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানির সুযোগ সীমিত এবং সংরক্ষণ খরচ বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা বড় পরিসরে আলু কিনছেন না। এছাড়া ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের দাপট আর মৌসুমে অতিরিক্ত ফলনের কারণে বাজারে চাহিদা কমে গিয়ে আলুর দাম পড়ে গেছে, যার সরাসরি ক্ষতি বহন করতে হয় কৃষকদের। পরিকল্পিত বাজার ব্যবস্থাপনা ও কৃষককেন্দ্রিক নীতি থাকলে এই ক্ষতি এড়ানো সম্ভব ছিল।
তারা বলছেন, পর্যাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান ও জনবল থাকা সত্ত্বেও কৃষকেরা বরাবরের মতোই উপেক্ষিত হয়ে আসছে। আগের সরকার সিন্ডিকেটকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে কৃষক ও ভোক্তা-উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, আর অন্তর্বর্তী সরকার সেই পথে না হাঁটলেও কার্যকর উদ্যোগ ও দৃশ্যমান পরিকল্পনার অভাবে সংকট সমাধানে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেনি।
রাজশাহী বিভাগের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহানা আখতার জাহান বলেন, আলুর ভরা মৌসুম এখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি। তাই পাইকারি ও খুচরা দামের মধ্যে পার্থক্য দেখা যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আগের বছরের তুলনায় আলুর আবাদ কিছুটা কমেছে, যা মৌসুমের শেষদিকে সরবরাহ ও দামে প্রভাব ফেলতে পারে।
সাখাওয়াত হোসেন/এনএইচআর/এএসএম