কুষ্টিয়ায় বিএনপির ভরাডুবির কারণ দলীয় কোন্দল-অপকর্ম

আল মামুন সাগর আল মামুন সাগর , জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ০৪:১৩ পিএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
  • বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়া
  • ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত সবগুলো সংসদ নির্বাচনে জয়ী
  • আওয়ামী লীগের ভোটও পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী

বিএনপির ‌‘শক্তিশালী ঘাঁটি’ হিসেবে পরিচিত কুষ্টিয়া জেলা। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে দলটির। জেলার চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে তিনটিতেই জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। মাত্র একটিতে জিতেছেন ধানের শীষের প্রার্থী।

পরাজয়ের কারণ হিসেবে মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দলীয় নেতাকর্মীদের দখল-চাঁদাবাজিসহ অপকর্মের লাগাম টেনে ধরতে না পারার পাশাপাশি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি কূটকৌশলকে দায়ী করা হচ্ছে।

নির্বাচনি তথ্য বলছে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বিএনপির শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল কুষ্টিয়া জেলা। ২০০৮ সালের আগে পর্যন্ত যতগুলো সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সবগুলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই ধানের শীষের প্রার্থী জয়লাভ করেছে। এর মধ্যে শুধু ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল ওয়াহেদ একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কুষ্টিয়ার চারটি আসনই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এ ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিল। এবার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতেই বিজয় ছিনিয়ে এনেছে জামায়াতে ইসলামী।

জেলার একমাত্র ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) সংসদীয় আসনে জয় পেয়েছেন রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা। এর আগে বাবার মৃত্যুজনিত কারণে অনুষ্ঠিত উপ-নির্বাচনে এবং পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার বাবা মরহুম আহসানুল হক পচা মোল্লাও এ আসনের তিনবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি বিএনপি সরকারের ডাক তার ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতে হঠাৎ এমন ভরাডুবি বিএনপির জন্য ‘বড় সতর্কবার্তা’। মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্ব, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা সবকিছু মিলিয়েই এমন শোচনীয় ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে বলে তারা মনে করছেন।

তারা বলছেন, সংকট উত্তরণে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে দলীয় কোন্দল নিরসন, তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে যে কোনো কমিটি গঠনে দলীয় নেতা-কর্মীদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার পাশাপাশি বিতর্কিতদের পরিবর্তে ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা জরুরি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরামর্শও দিয়েছেন তারা।

কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরীকে। মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই এ আসনের তিনবারের নির্বাচিত এমপি এবং কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক শহিদুল ইসলামের কর্মী-সমর্থকরা রাগিব রউফ চৌধুরীর মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে রাজপথে তীব্র আন্দোলন শুরু করেন। মনোনয়ন চূড়ান্ত ঘোষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ, মশাল মিছিল এমনকি কাফনের কাপড় পরিধান করে তারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেন। তীব্র আন্দোলনের মুখেও মনোনয়ন পরিবর্তন না হওয়ায় হতাশায় বিপুল ভোটব্যাংক হাতছাড়া হয়ে যায়।

কেন্দ্রের চাপে শহিদুল ইসলাম এবং তার ভাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তৌহিদুল ইসলাম আলম শেষ পর্যন্ত রাগিব রউফ চৌধুরীর পক্ষে মাঠে নামেন। তারপরও তাদের ভোটব্যাংক চলে যায় বিরোধী শিবিরে।

শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিএনপি নেতা-কর্মীদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি-দখলবাজিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে এখানকার মানুষ বিএনপির ওপর আস্থা রাখতে পারেনি। আর এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের দখলে নিয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল গফুর। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যে ভোটব্যাংক রয়েছে, সেটিও দখলে নিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয় বিএনপি। এই আসনে আগে থেকেই এলাকার মানুষের কাছে জনপ্রিয় এবং ক্লিন ইমেজের মানুষ হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামী কুষ্টিয়া জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত আমির আব্দুল গফুর।

কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট তৌহিদুল ইসলাম আলম বলেন, ‘কুষ্টিয়ার তিনটি আসনে দলের ভরাডুবির পেছনে অন্যতম কারণ ছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীকে ভোটের মাঠে নামানো। বিএনপির ঘাড়ে বন্দুক রেখে গর্ত থেকে বের হয়ে তারা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন। ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের প্রকাশ্যে অবস্থান নেতা-কর্মীসহ ভোটাররা ভালোভাবে গ্রহণ করেননি।’

কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারকে প্রায় ৫৩ হাজারেরও বেশি ভোটে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আলোচিত ইসলামি বক্তা আমির হামজা।

অন্তত ৫০ জন সাধারণ ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে এখানকার বিএনপি নেতা-কর্মীরা যখন হাট-ঘাট, বালুমহল দখল, চাঁদাবাজি-দখলবাজিতে ব্যতি ব্যস্ত; তখন জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা মন্দিরের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে কীভাবে সাধারণ মানুষকে তাদের দিকে ভেড়ানো যায়, নীরবে সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। বিএনপি নেতা-কর্মীদের অনেকেই নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে দলের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করেন।

ভোটাররা বলছেন, জামায়াতের নেতা-কর্মীরা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইতে অন্তত ৫-৬ বার করে এক একজন সাধারণ ভোটারের বাড়ি বাড়ি গেছেন। অন্যদিকে নির্বাচনি এলাকার বেশিরভাগ ভোটারদের বাড়িতে একবারও পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার শহরতলির একটি গ্রাম বটতৈল। শহর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরের ওই গ্রামের একটি এলাকা শিশির মাঠ। সেখানকার শরিফ, জহির ও সালামসহ কয়েকজন দাবি করেন, তাদের কাছে ভোট চাইতে কেউ আসেননি। বিএনপির দু-একজন নেতা এলাকায় এলেও চায়ের দোকানে গল্প করে ফিরে গেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দলের একটি বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ ছিল সাবেক সংসদ সদস্য ও কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ সোহবার উদ্দিনের হাতে। ওই অংশের অনেকেই মনে করেন, সোহরাব উদ্দিনকে দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ায় এ আসনে বিএনপির প্রার্থী প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকারের নির্বাচনে পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। ওই অংশের দাবি, সোহরাব উদ্দিনকে মনোনয়ন না দেওয়ায় চরম ক্ষুদ্ধ এবং হতাশ বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীরা নির্বাচনের মাঠে অনেকটাই নীরব থেকেছেন। ধানের শীষের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।

বিএনপির প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক নিজেদের কাছে টানতেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন। বিএনপির একটি পক্ষ আশা করেছিলেন, আওয়ামী লীগের ভোট তাদের ঝুঁলিতে পড়তে যাচ্ছে। তবে অনুসন্ধান বলছে, অনেকে বুকে ধানের শীষের ব্যাজ নিয়ে ঘুরেছেন, কিন্তু ভোট দিয়েছেন দাঁড়িপাল্লায়। এমন একটি এলাকা হলো কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার বটতৈল গ্রাম। সেখানে মিলপাড়ার অনেক ভোটার এই প্রতিবেদককে জানান, তাদের নির্দেশ ছিল দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার। কিন্তু ব্যাজ রাখতে হবে বিএনপির।

কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে বিএনপি দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয় বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা সাবেক এমপি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীকে। মনোনয়ন না পাওয়ায় কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক শেখ সাদী এবং কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম আনসার প্রামানিক সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমীর চরম বিরাগভাজন হন। উভয়ই মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে রাজপথে তীব্র আন্দোলন শুরু করেন। মনোনয়ন চূড়ান্ত ঘোষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ, মশাল মিছিল এমনকি কাফনের কাপড় পরিধান করে তারা আন্দোলন-সংগ্রাম করেন। তীব্র আন্দোলনের মুখেও মনোনয়ন পরিবর্তন না হওয়ায় চরম হতাশ হন সাদী এবং আনসার প্রামানিকের অনুসারীরা।

বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রর্থীর বিরুদ্ধে কাজ করার সুস্পষ্ট অভিযোগে কুমারখালী উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জাকারিয়া আনসার মিলনকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বহিষ্কৃত যুবদল নেতা জাকারিয়া আনসার কুমারখালী উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম আনসার প্রামানিকের ছেলে।

জেলার একমাত্র কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসন থেকে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে পুনরায় এমপি নির্বাচিত হয়েছেন রেজা আহমেদ ওরফে বাচ্চু মোল্লা। তিনিও দলের অন্যদের পরাজয়ের পেছনে অভ্যন্তরীণ কোন্দলকেই বড় করে দেখছেন।

রেজা আহম্মেদ বলেন, ‘কুষ্টিয়ায় পরাজয়ের একমাত্র কারণ দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। এর বাইরে আওয়ামী লীগের ভোট আশা করেও বিএনপির প্রার্থীরা প্রতারিত হয়েছেন।’

প্রায় একই মন্তব্য করেন কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের পরাজিত প্রার্থী ও কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার। তিনি বলেন, ‘আমাদের দলের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছিল। প্রচারের সময় আমরা দলের বড় একটি অংশকে সঙ্গে পাইনি। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে ভোটের মাধ্যমে ইউনিয়ন থেকে শুরু করে থানা ও উপজেলা কমিটি গঠনের সময় দলের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। যার প্রভাব পড়েছে জাতীয় নির্বাচনে।’

স্বাধীনতার পর ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে একবার জয় পেয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। এবার জেলার তিনটি আসনে জয় পেয়েছেন তারা। এ সফলতার পেছনের কারণ জানতে চাইলে কুষ্টিয়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি সুজা উদ্দিন জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘বিএনপি নেতা-কর্মীদের নেগেটিভ কর্মকাণ্ড ও দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দল আমাদের সুবিধা দিয়েছে। সেই সঙ্গে আমাদের নেতা-কর্মীদের জনসম্পৃক্ততা আমাদের পৌঁছে দিয়েছে জয়ের বন্দরে। মোটা দাগে বললে এই তিনটি কারণ আমাদের জয়ের জন্য বড় ভূমিকা রেখেছে।’

নিজ ঘাঁটিতে বিএনপির এ পরাজয়ের কারণ জানতে চাইলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ওবায়দুল হক বলেন, ‘ভোট অনেক সময় প্রচারের ওপরও নির্ভর করে। এবার সম্ভবত জামায়াতের নেতা-কর্মীরা ভোটারদের কাছে বেশি পৌঁছাতে পেরেছেন। নিজেদের লক্ষ্যের কথা জানাতে পেরেছেন। সর্বোপরি ভোটাররা বেছে নিয়েছেন। এর বাইরে ঢালাওভাবে বড় কোনো কারণ আমি দেখছি না।’

এসআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।