মৌলভীবাজারে পানি সংকটে ৬০ হাজার কৃষক, চাষাবাদ ব্যাহত

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ১০:০৭ এএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

মৌলভীবাজারে পানি সংকটে অন্তত ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে যারা বোরো ধান চাষ করছেন, এমন অন্তত প্রায় ৬০ হাজার কৃষক পানি সংকটে ভুগছেন। অনেক কৃষক টাকা দিয়েও সেচের ব্যবস্থা পাচ্ছেন না। বোরো আবাদের ভরা মৌসুমে সেচ সংকটে কৃষকেরা আবাদি জমি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। অনেকে জমিতে চারা রোপণের পর সেচ সংকটে পড়েছেন। আবার কেউ সেচের অভাবে চারা রোপণ করতে পারছেন না।

পানি সংকট এলাকার কৃষকেরা বলেন, সরকার যদি আমাদের বোরো ধান চাষে পানির ব্যবস্থা করে দেন, তাহলে আমন মৌসুমের মতো বোরো ধান চাষ করা সম্ভব। তবে বছরের পর বছর যায়, সেচের কোনো ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় না। বিভিন্ন সেচনালা খনন না করার কারণে পানি আসে না। হাওর ও নন-হাওর এলাকাসহ সব জায়গায় পানির সমস্যা।

সরেজমিনে জেলার সাতটি উপজেলার হাকালুকি, কাউয়াদিঘী, কেওলার হাওরসহ নন-হাওর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হাওরে যেমন পানির সংকট, ঠিক একইভাবে নন-হাওর এলাকাতেও তীব্র পানির অভাব রয়েছে। অনেক জমিতে ধানের চারা রোপণের পরেও শুকিয়ে খাঁ খাঁ করছে। আবার কেউ পানির অভাবে চারা রোপণ করতে পারেননি। একরপ্রতি ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ করে বোরো ধান চাষ করেও পানির অভাবে সবকিছু নষ্ট হচ্ছে কৃষকের। জেলায় অন্তত প্রায় ৬০ হাজার কৃষক পানি সংকটে আছেন। এ সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বোরো ধানের চলতি মৌসুমে জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার ৩৪৫ হেক্টর হাওর এলাকায় এবং নন-হাওর এলাকায় ৩৫ হাজার ৫৫ হেক্টর। তবে এসব এলাকায় তীব্র সেচ সংকট রয়েছে। সাতটি উপজেলায় সরকারি ভাবে ১৪টি সৌর সেচ চালু আছে। এর সংখ্যা বৃদ্ধি করলে সেচ সমস্যার কিছুটা সমাধান হতো। সেচের সংকট না হলে অন্তত আরও ৩০ হাজার হেক্টর জমি বোরো মৌসুমে চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলার পতনঊষার, শমশেরনগর, আলীনগর ও আদমপুর ইউনিয়নে লাঘাটা নদীর পানি উজানে কম যাওয়ার কারণে সেচ সংকট রয়েছে। জেলার সদর উপজেলার গিয়াসনগর, মোস্তফাপুরসহ কয়েকটি ইউনিয়ন এবং কাঞ্জার হাওরের নিম্নাঞ্চলে পানি সংকট রয়েছে। কুদালী ছড়ার প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার হেক্টর বোরো ধান চাষাবাদে পানি সংকটে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কয়েক হাজার কৃষক। রাজনগর ও সদর উপজেলায় পানি সংকটের শঙ্কায় রয়েছেন প্রায় ১০ হাজার কৃষক।

মৌলভীবাজারে পানি সংকটে ৬০ হাজার কৃষক, চাষাবাদ ব্যাহত

কাউয়াদিঘী হাওরে সেচ-সুবিধা দিতে তৈরি করা ১০৫ কিলোমিটার সেচনালা নতুন করে খননের অভাবে ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে উঁচু হয়ে গেছে। ফলে প্রতিবছর বোরো মৌসুমে সেচের পানি নিয়ে হাওরপাড়ের কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। এছাড়া রাজনগর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নেও পানি সংকট রয়েছে। অনেক স্থানে ক্রসবাঁধ ও স্লুইসগেট দিয়ে পানি আটকিয়ে চাষাবাদ করায় উজানের কৃষকেরা পানি পাচ্ছেন না।

কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর, শরীফপুর, পৃথিমপাশাসহ বেশকিছু ইউনিয়নে কয়েক হাজার কৃষক পানি সংকটে রয়েছেন। হাকালুকি হাওরের উপরের অংশেও তীব্র পানি সংকট রয়েছে। হাওরের গভীর অংশ থেকে ফিতা পাইপের মাধ্যমে পানি নিয়ে আসতে হয়। এছাড়া জেলার জুড়ি ও বড়লেখায় পানি সংকটে বোরো ধান আবাদ ব্যাহত হচ্ছে।

কুলাউড়া উপজেলার কৃষক সালমান মিয়া ও কমলগঞ্জের মর্তুজ আলী বলেন, পানির আশায় বোরো ধান চাষ করি। পরে আর পানি মেলে না। অনেক টাকা খরচ করে শূন্য হাতে ফিরতে হয়। ফসল বাঁচানোর জন্য অনেক দূর থেকে পানি আনতে হয়। মৌসুমের শুরুতে কিছু পানি পাওয়া গেলেও মাঝামাঝি সময়ে একেবারেই পাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, যেসব এলাকায় সেচনালা আছে, সেখানে কমবেশি পানি পাচ্ছেন কৃষকেরা। যেখানে সেচনালা নেই, সে বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। সেচনালায় সমস্যা হলে আমরা সমাধানের চেষ্টা করি।

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দীন বলেন, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানির সংকট রয়েছে। বিভিন্ন নালা ও ছড়া দিয়ে পর্যাপ্ত পানি যাচ্ছে না, যার ফলে এ সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া নলকূপের সমস্যার কারণে কৃষকেরা পানি পাচ্ছেন না। পর্যাপ্ত পরিমাণে নলকূপ বা সেচের ব্যবস্থা করলে এ জেলায় অন্তত আরও ৩০ হাজার হেক্টর বোরো ধান আবাদ বৃদ্ধি করা যাবে। শুধু কোদালি ছড়া সেচনালা খনন করলেও কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ সম্ভব। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবগত করেছি—যেসব ছড়া বা নালা দিয়ে পানি পাওয়া যাচ্ছে না, সেগুলো যেন খনন করা হয়।

এম ইসলাম/আরএইচ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।