পাবনা

বেচাকেনা মন্দা, ঈদের বাজারেও হতাশায় তাঁতিরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পাবনা
প্রকাশিত: ১১:০১ এএম, ১৮ মার্চ ২০২৬

সুতার চড়া দাম ও বিদেশি ক্রেতা না আসায় দেশীয় ক্রেতায় নির্ভরতায় ঈদেও মন্দা কাটছে না পাবনার তাঁত কাপড়ের বাজারে। পাবনার পার্শ্ববর্তী জেলা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও পাবনার আতাইকুলায় বসে উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় তাঁতের কাপড়ের হাট। কয়েক বছর আগেও রমজানের এ সময়ে হাটে পা ফেলার জায়গা না থাকলেও এখন চিত্র ভিন্ন।

পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি গ্রামের পাওয়ার লুম মালিক উজ্জ্বল বিশ্বাস জানান, গতবছরও এই সময়ে উৎপাদিত শাড়ি ও লুঙ্গির ৯০ শতাংশই তৈরির সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি হয়ে যেত। কিন্তু এবার বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ।

একই দুর্দশার কথা জানান কয়েক পুরুষ ধরে তাঁত কাপড়ের ব্যবসা করে আসা উপজেলার কুলুনিয়া গ্রামের আব্দুস সাত্তার। প্রতি সপ্তাহে অন্তত দেড়শ থেকে দুইশ থান (প্রতি থানে ৪টি লুঙ্গি) কাপড় অনায়াসে বিক্রি করতেন তিনি। কিন্তু এবারের চিত্র পুরো উল্টো। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, এবার গত তিন-চারটি হাটে আমার সর্বোচ্চ বিক্রি হয়েছে মাত্র ১২০-১৫০ থান। অথচ সামনেই ঈদ, এখন তো দম ফেলার সময় থাকার কথা ছিল না।

তথ্য বলছে, তাঁতশিল্প তথা লুঙ্গি বুননে পাবনার ঐতিহ্য পুরোনো। জেলার সদর উপজেলার দোগাছি, কুলুনিয়া, সাদুল্লাহপুর, রাজাপুরের নতুনপাড়া, আটঘরিয়া উপজেলার চাচকিয়া, লক্ষ্মীপুর, গোপালপুর ও সাঁথিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে বুনন করা হয় হাতে বোনা ও মেশিনে তৈরি লুঙ্গি। আড়াইশ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা দামের পর্যন্ত লুঙ্গি তৈরি হয় এখানে। গুণগত মানে পাবনার লুঙ্গির সুখ্যাতি বহুদিনের।

বেচাকেনা মন্দা, ঈদের বাজারেও হতাশায় তাঁতিরা

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় ঈদকে ঘিরে ব্যস্ততা বেড়েছে পাবনার তাঁতপল্লীগুলোতে। তবে ঈদের সেই রমরমা আমেজ নেই তাদের মনে। সুতার চড়া দাম আর ক্রেতা সংকটে ব্যবসায় মন্দা তাঁত ব্যবসায়ীদের। দুই-তিন বছর আগেও ভারতসহ প্রতিবেশী দেশের ক্রেতারা নিয়মিত পাবনায় আসতেন এবং হাট থেকে বিপুলসংখ্যক তাঁত কাপড় ক্রয় করতেন। তখন ঈদের বাজার ছিল অনেক চাঙ্গা। কিন্তু এবার বিদেশি ক্রেতা নেই বললেই চলে। ফলে এ বছর ঈদের মৌসুমে তাঁতিদের মুখেও হাসি নেই।

আকস্মিকভাবে সুতার মূল্য বেড়ে গেলেও কাপড়ের দাম বাড়েনি। এতে তেমন লাভের মুখ দেখছেন না তাঁতিরা। এর সঙ্গে আবার ক্রেতা সংকট যুক্ত হয়ে তাঁতিরা আরো বিপাকে পড়েছেন জানিয়ে সুজানগর উপজেলার কুড়িপাড়া গ্রামের তাঁতি মো. হোসেন বলেন, ৮০ কাউন্টের এক বেল (১০০ পাউন্ড) সুতার দাম ২৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে এখন ২৭ হাজার ৩০০ টাকা হয়েছে। কাপড় বুননে খরচ বেড়েছে, এদিকে ক্রেতা নেই। ঈদ কিভাবে থাকে আমাদের? তবুও ঈদ বাজারের শেষ সময়ের আশায় আছি।

পাবনা বড় বাজারের লুঙ্গী দোকানি রাফিউল জাগোনিউজকে জানান, লুঙ্গীর বাজার নাই। বিদেশি ক্রেতা না থাকায় তাঁতিদের এখন পুরোপুরি দেশি পাইকারদের ওপরই নির্ভরশীল হতে হয়েছে। দেশি বাজারেও তেমন বেচাকেনা নাই। ঈদে জাকাতের সুবাদে বড় একটা বেচাকেনা হতো। কিন্তু এখন শাড়ি লুঙ্গীর বদলে জাকাত বা দান হিসেবে নগদ টাকা দেবার প্রচলন আসায় সেটিও নেই। নতুন প্রজন্ম তো লুঙ্গী চেনেই না, ফলে সাধারণ ক্রেতাদের কাছেও বেচাকেনাও ভালো নয়। আর বাজার খারাপ হলে উৎপাদনকারী বা তাঁতি অথবা তাঁত ব্যবসায়ীদের অবস্থা ভালো হবে কী করে। মূলত এভাবেই তাঁত, তাঁতের কাপড় আধারে ঢেকে যাচ্ছে।

বেচাকেনা মন্দা, ঈদের বাজারেও হতাশায় তাঁতিরা

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের পরিকল্পনা প্রধান (হেড অব প্লানিং) মো. আইয়ুব আলী জানান, দেশে হস্তচালিত ও বিদ্যুৎচালিত উভয় খাত মিলিয়ে বছরে মোট ৮০ কোটি মিটার কাপড় উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে হস্তচালিত তাঁত থেকে আসে ৪৭.৭৭ কোটি মিটার। উৎসবের সময় এই কাপড়ের চাহিদা তুঙ্গে থাকে। সাধারণত শবে বরাতের পর পাইকারি বাজার জমে ওঠে এবং ঈদের দুই সপ্তাহ আগে খুচরা বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তবে এবার শাহজাদপুর ও পাবনার আতাইকুলা হাটে গিয়ে দেখা গেছে, উৎপাদন চললেও আগের তুলনায় বিক্রি অনেক কম।

বর্তমানে দেশে হস্তচালিত ও বিদ্যুৎচালিত মিলিয়ে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ তাঁত সচল আছে। যার বড় অংশই পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নরসিংদী ও পার্বত্য জেলাগুলোতে। ২০১৮ সালের শুমারি অনুযায়ী ৩ লাখ হস্তচালিত তাঁত থাকলেও বর্তমানে পুঁজি সংকটে প্রায় ১ লাখ হস্তচালিত তাঁত বন্ধ রয়েছে জানিয়ে বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা হায়দার আলী বলেন, অনেকে ঈদের আশায় ঋণ করে টাকা খাটান। কিন্তু কাঁচামালের দাম বাড়লেও কাপড়ের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে অনেকেই পৈতৃক পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

তাঁত বোর্ডের উপমহাব্যবস্থাপক (বিপণন) রতন চন্দ্র সাহা জাগো নিউজকে জানান, হস্তচালিত তাঁত প্রতিবছর কমলেও পাওয়ার লুমের সংখ্যা বাড়ছে। এই দুই খাত মিলে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ২৮ শতাংশ মেটায়। তবে দক্ষ শ্রমিকের অভাব ও ক্রমাগত লোকসানের কারণে অনেক শ্রমিক পেশা ছেড়ে দেওয়ায় এই শিল্পে বড় শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।

আলমগীর হোসাইন নাবিল/এমএন/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।