পানিশূন্য তিস্তা ব্যারাজ, কাজে আসছে না হাজার কোটির সেচ প্রকল্প
দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প ‘তিস্তা ব্যারাজ’ এখন উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের কাছে এক দীর্ঘশ্বাসের নাম। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মাইলের পর মাইল সেচনালা (ক্যানেল) এখন পানির অভাবে ধু-ধু মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানির প্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় প্রকল্পের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের লাখো কৃষক। ফলে বাধ্য হয়ে কয়েকগুণ বেশি খরচে শ্যালো মেশিনের মাধ্যমে বিকল্প সেচ ব্যবস্থায় চাষাবাদ করতে হচ্ছে তাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচের পানির সমস্যা সমাধানে তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে এই অঞ্চলে সেচ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। এই লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি সেচনালা (ক্যানেল) নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্পটির আওতায় নীলফামারীর সদর, ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও সৈয়দপুর; রংপুর জেলার সদর, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, গঙ্গাচড়া এবং দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর, খানসামা ও চিরিরবন্দরের কৃষকরা চাষাবাদের জন্য সেচ পেত। কিন্তু গত তিন দশকেও সেই লক্ষ্যমাত্রার ধারের কাছেও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম দিকে অর্থ সংকটসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়। থেমে থেমে চলছে এর কাজ। ধারণা করা হয়েছিল, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প এলাকায় প্রতিবছর অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হবে। এছাড়া ৫ দশমিক ২৭ লাখ মেট্রিক টন অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। তখন সেচ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৮৪ হাজার ৩৭৮ হেক্টর জমি। এদিকে চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে সেচ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৭ হাজার হেক্টর জমিতে।
প্রকল্প এলাকায় সেচনালায় পানি না পাওয়ার কারণ হিসেবে কর্তৃপক্ষ মনে করছে, ভারত অংশে গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি সরিয়ে নেওয়ার ফলে বাংলাদেশ অংশে পানির এই হাহাকার তৈরি হয়েছে। ফলে ক্যানেল সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হলেও মূল উৎস নদীতে পানি না থাকায় কৃষকদের কোনো কাজেই আসছে না এসব সেচনালা। অথচ তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় নতুন নতুন স্লুইস গেট ও পাকা ক্যানেল তৈরি হলেও সেখানে আজ পর্যন্ত একবারও পানি পৌঁছায়নি। এ কারণে প্রকল্পের আওতাধীন ৬০-৭০ শতাংশ কৃষক এখন বিকল্প সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।
তারা বলছেন, তিস্তা ব্যারেজে বর্ষা মৌসুমে যেখানে পানিপ্রবাহ গড়ে ২ লাখ কিউসেক ছাড়িয়ে যায়। তবে শুষ্ক মৌসুমে তা নেমে আসে মাত্র ২ হাজার কিউসেকে। আবার কখনও কখনও এ প্রবাহ ৫০০ কিউসেকের নিচেও নেমে আসছে। ফলে লাখো কৃষকদের নির্ভর করতে হচ্ছে বিকল্প সেচ ব্যবস্থার ওপর।

কর্তৃপক্ষের দাবি, তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পটি নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের ১২টি উপজেলায় বিস্তৃত। বর্তমানে যার ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এ কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৪ সালের জুনে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না পাওয়ায় কাজের গতি কিছুটা কমেছে। তবে প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ব্যয় না বাড়িয়ে এ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। তবে কাজ প্রায় শেষের দিকে হলেও সরেজমিনে দেখা গেছে, সেচনালাগুলো শুকিয়ে কাঠ। অথচ সরকারি নথিতে দেখানো হচ্ছে পানির পর্যাপ্ততা।
তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে সেচ সুবিধা না পাওয়ার আক্ষেপের কথা জানিয়ে ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের কৃষক শুকারু মাহমুদ বলেন, তিস্তার সেচের পানি নিতে বছরে বিঘাপ্রতি জমির জন্য ৪০০ টাকা করে দেওয়া কথা। এত কম টাকায় সেচ সুবিধা পেলে আমাদের ফসল উৎপাদন খরচ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতো। কিন্তু এখ পর্যন্ত আমরা এ সুবিধা পাচ্ছি না।
একই এলাকার কৃষক তাহের আলী বলেন, সেচ প্রকল্পটি শতভাগ বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলের কৃষকদের ধানসহ বারো মাসে অন্যান্য ফসল উৎপাদনে অনেক উপকারে আসবে। জলঢাকা উপজেলার শৌলমাড়ি ইউনিয়নের কৃষক সাজু মিয়া জানান, গত কয়েক আগে তার আবাদি জমির পাশ দিয়ে সেচনালা নির্মাণ হলেও মৌসুমে চাহিদা মতো পানি পাওয়া যায়নি। ফলে বাধ্য হয়ে বেশি খরচে শ্যালো দিয়ে পানি নিতে হয়েছে।
তিস্তা ব্যারেজ এলাকার কয়েকজন কৃষক আবু তাহের, বিধান চন্দ্র রায় ও রইজ উদ্দিন মিয়া বলেন, নদীর পানি পাইলে আমাদের বিঘাপ্রতি খরচ হতো ২০০-৩০০ টাকা। এখন শ্যালো মেশিনে ডিজেল পুড়িয়ে খরচ হচ্ছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা। সার ও তেলের দাম বেশি, আবার পানির জন্যও বাড়তি টাকা। আমরা বাঁচব কীভাবে? তাদের মতে এ সম্প্রসারণ খালগুলো কোনো কাজে আসছে না।
এ বিষয়ে ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরীর জানান, ব্যারাজের উজানে বর্তমানে সর্বোচ্চ ২৫০০ কিউসেক পানি পাওয়া যাচ্ছে। তবে ব্যারাজের ভাটিতে ১১০ কিলোমিটার এলাকায় ২০০ কিউসেক পানিও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পানি না থাকার কথা অস্বীকার করে নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম যাকারিয়া বলেন, প্রকল্প এলাকায় পর্যাপ্ত পানি রয়েছে। কিছু এলাকায় কৃষকদের অনুরোধে পানির প্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে। তিনি নতুন যোগদান করেছেন বলে এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি এ কর্মকর্তা।
আমিরুল হক/কেএইচকে/এমএস