কক্সবাজার

ঠান্ডা নাকি হাম, শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন বিভ্রান্ত অভিভাবকরা

সায়ীদ আলমগীর
সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর কক্সবাজার
প্রকাশিত: ০১:৩৯ পিএম, ০১ এপ্রিল ২০২৬
  • কক্সবাজার সদর হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড চালু
  • হামের উপসর্গে এক শিশুর মৃত্যু
  • একদিনেই নতুন করে ১১ শিশু ভর্তি
  • মার্চে হাম উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ১১৯ শিশু

কক্সবাজারে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে শিশুদের ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ। তাদের অনেকের মাঝে হামের লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। জেলা সদর হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে খোলা হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড।

মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) পর্যন্ত কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ৩৭টি শিশু। এদের মাঝে ১১ শিশু মঙ্গলবারই ভর্তি হয়। চিকিৎসা চলছে বেসরকারি হাসপাতালেও।

এরই মধ্যে রোববার সন্ধ্যায় হামের উপসর্গ নিয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হার্টফেলিও নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়ার পর তার পরীক্ষা করা হয়। মঙ্গলবার তার রিপোর্ট পেয়ে জানা গেছে নিউমোনিয়ার পাশাপাশি শিশুটির হামেরও লক্ষ্মণ ছিল। সদর হাসপাতালের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সেলিম উল্লাহ বিষয়টি জানিয়েছেন।

সদর হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল আলম জানান, হার্টফেলিও নিউমোনিয়া নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুটির আরও জটিলতা ছিল। আগে থেকেই ভুগছিল অপুষ্টিতে। প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও বাঁচানো যায়নি শিশুটিকে। মৃত্যুর পর পরীক্ষার রিপোর্টে জানা যায় তার মাঝে হামের উপসর্গও ছিল।

ঠান্ডা নাকি হাম, শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন বিভ্রান্ত অভিভাবকরা

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সেলিম উল্লাহ জানান, সদর হাসপাতালে মঙ্গলবার নতুন করে ১১টি শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। এইদিনে মোট ভর্তি ৩৭ শিশু। পুরো মাসে হামের লক্ষণে মোট ভর্তি শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৯ জনে। এদের মাঝে ৮২ শিশু চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।

সদর হাসপাতালে শিশু নিয়ে চিকিৎসাধীন থাকা রামুর মিঠাছড়ির বাসিন্দা বিবি মরিয়ম বলেন, ‘আমার যমজ বাচ্চার হঠাৎ জ্বর এবং সর্দি হলে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তার দেখাই। ওখানে দেওয়া ওষুধপত্র সেবনসহ প্রায় ৭ দিন গ্যাস দিই। কিন্তু কোনো উন্নতি হয়নি। পরে আরেক চিকিৎসক দেখালে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে ভর্তি করতে বলে। ঈদের পরদিন থেকে এখনো ভর্তি আছি।’

ভর্তি আরেক শিশুর মা মহেশখালীর শাপলাপুরের রুমা আফরোজ বলেন, ‘আমার বাচ্চার হঠাৎ জ্বর-সর্দি হলে মহেশখালী হাসপাতালে নিয়ে যাই। ওখান থেকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রেফার করে। অবস্থা খুবই খারাপ। বেশি কান্না করছে। দুধও খাচ্ছে না ঠিকমতো।’

শাহীনুর আক্তার বলেন, ‘আমার ভাগনিকে তিনদিন আগে এ হাসপাতালে ভর্তি করি। হামে আক্রান্ত হয়ে অনেক কষ্টে তিনদিন চিকিৎসা নিয়ে এখন একটু উন্নতির পথে।’

হাসপাতালের শিশু স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শহিদুল আলম জানান, হামের জন্য সদর হাসপাতালে আলাদা ওয়ার্ড, আলাদা নার্স বরাদ্দ হয়েছে। যেসব সরঞ্জাম দরকার সবকিছু সরবরাহ করা হয়েছে। তবে, ঠান্ডাজনিত রোগ ও জ্বর নিয়ে এলেই হামের উপসর্গ ভেবে অভিভাবকরা বিচলিত হচ্ছেন। এতে চাপে পড়ে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের দায়িত্বশীলদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতিদিন রোগী ভর্তি হচ্ছে। সকলের সহযোগিতা পেলে আশা করি আমরা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারবো।

ঠান্ডা নাকি হাম, শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটছেন বিভ্রান্ত অভিভাবকরা

কক্সবাজার সদর হাসপাতাল ছাড়াও কক্সবাজার জেনারেল হাসপাতাল, ইউনিয়ন হাসপাতালসহ অন্যান্য হাসপাতালেও চলছে শিশুদের হামের চিকিৎসা।

কক্সবাজার জেনারেল হাসপাতালের সুপারভাইজার ইরফানুল হক সবুজ বলেন, জেনারেল হাসপাতালে ১৫ রমজান থেকে হাম রোগে আক্রান্ত শিশু ভর্তি হতে শুরু করে। সেটি দিন দিন বাড়তে থাকে। সোম ও মঙ্গলবার ৫ জন শিশু ভর্তি রয়েছে।

কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. এমএম আলমগীর বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা দিচ্ছে। জেলার মহেশখালী, হোয়াইক্যং, রামুর মিঠাছড়ি, শহরের কালুরদোকান, পাহাড়তলি, রুমালিয়ার ছড়া এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি।

তিনি আরও জানান, হামের টিকা ৯ মাসে এবং ১৫ মাসে দুইবার দেওয়া হয়। কক্সবাজারের ৯৫ শতাংশ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনা হয়েছে এবং হামের টিকার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কক্সবাজার অন্যান্য জেলার চেয়ে ভালো থাকে সবসময়। তবুও কিছু শিশুর সাকসেস রেট কম। এছাড়া আমরা নারীদের ঘরে ঘরে গিয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করি।

চিকিৎসকদের মতে, ভিটামিন-এ এর অভাবে হাম রোগ হয়ে থাকে। অভিভাবকেরা সচেতন হলে হাম রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। হাম হলে শিশুদের নিয়ে বাড়ির পাশের ফার্মেসিতে না নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

চিকিৎসকদের মতে, হাম মূলত ৬ থেকে ৫ বছরের শিশুদের হয়ে থাকে। এই রোগ হলে বাচ্চাদের তীব্র জ্বর আসবে, সর্দি হবে, কাশি হবে, চোখ লাল হবে, নাক দিয়ে পানি পড়বে। জ্বরের চতুর্থ দিন গায়ে ফুসকুড়ি বা রেশ উঠবে। মূলত যেসব বাচ্চা অপুষ্টিতে ভোগে তাদের হামের তীব্রতা বেশি। এটা একটি ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ। এই রোগ বাচ্চাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়। এর ফলে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগ হয়- এর প্রভাবে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখে প্রদাহ ও মুখে ঘা হয়। মূলত নিউমোনিয়া হলে বাচ্চাদের অবস্থা খারাপ হয়।

সায়ীদ আলমগীর/এফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।