দুধে ডুবছে খামারিদের স্বপ্ন

এম এ মালেক
এম এ মালেক এম এ মালেক , জেলা প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৪:৩৭ পিএম, ০৮ এপ্রিল ২০২৬
সিরাজগঞ্জে খামারি থেকে দুধ কিনছেন ক্রেতা। ছবি: জাগো নিউজ

খরচ বাড়ে, দাম পড়ে—এই দ্বিমুখী চাপে দুধ খাতে গভীর সংকটে পড়েছেন সিরাজগঞ্জের খামারিরা। উৎপাদন খরচ লাগামহীনভাবে বাড়লেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় প্রতিদিনের দুধ বিক্রি করতেই হিমশিম খাচ্ছেন তারা। তার ওপর জ্বালানি সংকটে পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় বাজারে দুধ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে লোকসানের বোঝা আরও ভারী হয়ে উঠছে।

দেশের অন্যতম গরুর দুধ উৎপাদনকারী এ অঞ্চলের খামারিরা বলছেন, ৪৫-৫০ টাকা লিটার দরে দুধ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অথচ প্রতি লিটার দুধের উৎপাদন খরচ পড়ে ৮০ টাকার বেশি।

এ ছাড়া জ্বালানি তেলের প্রভাবে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাইরে থেকে খড়, ভূসিসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য আসতে না পারায় হঠাৎ করেই গোখাদ্যের দাম বেড়ে গেছে। এতে খামারিদের লোকসান আরও বেড়েছে।

সিরাজগঞ্জ বাঘাবাড়ি দুগ্ধ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান ও খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, চৌহালী, তাড়াশ এবং পাবনার বেড়া, সাঁথিয়া, ফরিদপুর, ভাঙ্গুড়া, চাটমোহর উপজেলা নিয়ে গড়ে উঠেছে দেশের প্রধান গরুর দুধ উৎপাদনকারী এলাকা।

প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার কিছু অংশে ছোট বড় মিলে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি খামারে প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ লিটার গরুর দুধ উৎপাদিত হয়। যার মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার লিটার দুধ সমিতির মাধ্যমে সংগ্রহ করে মিল্কভিটা। বাকি প্রায় ৮ লাখ লিটার দুধ প্রাণ ও আড়ং কোম্পানিসহ আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এ অঞ্চল থেকে তরল দুধ সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে সারাদেশের বাজারে সরবরাহ করে থাকে। এছাড়া স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নিয়মিত দুধ ক্রয় করে দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করেন।

খামারিদের অভিযোগ, দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খামারিদের দুধ বিক্রি করার প্রধান ভরসা। তবে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান খামারিদের কাছ থেকে দুধ কেনাও কমিয়ে দিয়েছে। ফলে খামারিদের উৎপাদিত দুধের একটি বড় অংশ অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। এই দুধ খামারিরা খোলাবাজারে ৪৫-৫০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন

তারা আরও বলেন, গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি লিটার দুধের উৎপাদন খরচ পড়ে ৮০ টাকার বেশি। কিন্তু বাঘাবাড়ি মিল্কভিটা ও দুধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান প্রতি লিটার দুধের ঘনত্ব অনুযায়ী দাম দেয় ৫৫-৬০ টাকা। এখন এ দামেও অনেকে মিল্ক ভিটায় দুধ বিক্রি করতে না পারায় খামারিদের লোকসানের পাল্লা আরও ভারি হচ্ছে।

দুধে ডুবছে খামারিদের স্বপ্নখামারে গরু পালন। ছবি: জাগো নিউজ

শাহজাদপুর রাউতারা এলাকার খামারি আবুল কাশেম জাগো নিউজকে বলেন, রোজার ঈদের পর থেকেই দুধের চাহিদা কমতে শুরু করেছে। এ ছাড়া এলাকার ছানা তৈরির বেশ কিছু কারখানা দুধ কেনা কমিয়ে দিয়েছে। ছানা তৈরির কারখানাগুলো আগে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করতো। এখন সংগ্রহ করে ৩০ থেকে ৫০ হাজার লিটার। তারা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই ছানা সরবরাহ করতো। এখন সেটাও কমে গেছে। তাই বেশ কিছু ছানা তৈরির কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন:
জেলি-তেল-সোডা মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে ভেজাল দুধ!
ফ্রিজে দুধ জ্বাল দিয়ে নাকি প্যাকেটসহ রাখলে ভালো থাকবে?
বাঁশ শিল্পে বিষাদের ছায়া
যুদ্ধের প্রভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা

বাঘাবাড়ি এলাকার দুধ ব্যবসায়ী মকবুল হোসেন। তিনি স্থানীয় খামারিদের কাছ থেকে দুধ কিনে ঢাকার স্থানে পৌঁছে দেন। কিন্তু জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দুধ কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। রোজার মধ্যে প্রতিদিন তিনি ৫ থেকে ৭ হাজার লিটার দুধ ঢাকায় পাঠাতেন। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে ১ হাজার থেকে দেড় হাজার লিটার দুধ পাঠাচ্ছেন।

মকবুল হোসেন জানান, খামারিদের থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রতি লিটার দুধ ৫৫-৬০ টাকায় কিনতেন। দুই সপ্তাহ ধরে ৪৮ থেকে ৫৪ টাকা লিটার দরে দুধ কিনেছেন। এরপরও সম্প্রতি পরিবহন ব্যয় বাড়ায় অনেক খামারির দুধ তিনি কিনতে পারেননি। তবে জ্বালানি সংকট শেষে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় কমলে প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ হাজার লিটার দুধ কিনবেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে গত কয়েক মাস ধরে খামারিদের প্রায় দ্বিগুণ দামে গোখাদ্য কিনতে হচ্ছে।

খামারিরা বলছেন, রোজার ঈদের পর খড়ের দাম প্রতি মণে দেড়শো টাকা বেড়েছে। এর আগে প্রতি মণের দাম ছিল ৫৫০ টাকা। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৬৫০ টাকায়। আর ভূসির প্রতি বস্তার (৩৭ কেজি) দাম ২ হাজার ২০০ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে।

শাহজাদপুর উপজেলার খামারি আইয়ুব আলী জাগো নিউজকে বলেন, আমরা এমনিতেই দুধের ন্যায্য দাম পাই না। তার ওপর বড় প্রতিষ্ঠানগুলো দুধ সংগ্রহ কমিয়ে দেওয়ায় উৎপাদিত দুধ খোলাবাজারে লোকসান দিয়েই বিক্রি করছি। এর মধ্যে ‘মরার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে গোখাদ্যের দাম বেড়েছে। এ অবস্থায় আমরা খামারিরা আর পারছি না

শাহজাদপুরের দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি শহিদ আলী বলেন, শুধু শাহজাদপুরেই দুগ্ধ খামারি আছেন প্রায় ৩০ হাজার। যা থেকে প্রতিদিন দুধ উৎপাদন হয় ৫ লাখ লিটার। ছোট-বড় দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কোম্পানি প্রতিদিন খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে সাড়ে ৩ লাখ লিটার। বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে মিল্কভিটা, আড়ং, প্রাণ, ইগলু ও আকিজের দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র।

মিল্কভিটার বাঘাবাড়ীঘাট দুগ্ধ এলাকার উপ-মহাব্যবস্থাপক ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. খন্দকার রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, ৪৫০টি সমিতির মাধ্যমে প্রতিদিন ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার লিটার দুধ ৫৮ থেকে ৬০ টাকা দরে সংগ্রহ করা হয়।

এনএইচআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।