যুদ্ধের প্রভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা

এমদাদুল হক তুহিন
এমদাদুল হক তুহিন এমদাদুল হক তুহিন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০৮ এএম, ০৮ এপ্রিল ২০২৬
টিকে থাকার লড়াই করছেন প্রায় সব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

‘কর্পোরেট অর্ডার প্রায় বন্ধ। পাইকারি অর্ডারও আগের মতো নেই। রোজার ঈদের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো পাইকারি কাস্টমার পাইনি, অথচ এ সময়ে অনেক ক্রেতা থাকার কথা ছিল। কিন্তু সব ধরনের বিক্রি একেবারে কমে গেছে।’

কথাগুলো বলছিলেন চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা (এসএমই) তাহমিনা আক্তার শাম্মী।

প্রায় একই রকম কথা বলেন প্লাস্টিকের খেলনা তৈরি করে এমন একজন এসএমই উদ্যোক্তা আমান উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময় অ্যাক্সেসরিজ এবং র-মেটেরিয়ালস থার্ড পার্টি থেকে সোর্স করি। এখন এই যুদ্ধ ও তেল সংকটের কারণে থার্ড পার্টি যারা আছেন, তারা মালের দাম ডাবল করে ফেলেছেন। এ কারণে এসএমই খাত ভীষণভাবে অ্যাফেক্টেড হচ্ছে।’

আরও পড়ুন
তেল সংকট ও রপ্তানি কমার অজুহাতে বেড়েছে পিকআপ-কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া
৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে ট্রাকভাড়া, বাড়ছে মাছের দাম
জ্বালানি সংকটে বান্দরবানে হোটেল-রিসোর্টে কমেছে আগাম বুকিং
তেল সংকটে কঠিন হচ্ছে চরাঞ্চলের জীবন-জীবিকা

শুধু এই দুজন নন, দেশের প্রায় সব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার কণ্ঠে একই সুর উঠে এসেছে। তারা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে দেশের এসএমই খাতেও। এক মাস ধরেই কমছে বিদেশি ক্রয়াদেশ, প্রভাব পড়েছে রপ্তানি আয়েও। জ্বালানি সংকটে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদনও। রাতে দোকানপাট বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রভাবও পড়তে শুরু করেছে। সবমিলিয়ে দেশের অভ্যন্তরেও বিক্রি কমেছে। উৎপাদন খরচ বাড়ায় ও বিক্রি কমে যাওয়ায় হিমশিম খেতে হচ্ছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের।

যুদ্ধের প্রভাবে উদ্যোক্তারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন মন্তব্য করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এসএমই খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উৎপাদন, বিপণন ও রপ্তানি- সব ক্ষেত্রেই ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। খুব মারাত্মক প্রভাব না পড়লেও সামগ্রিকভাবে খাতটি স্লো হয়ে গেছে। জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি, সময়মতো পণ্য সরবরাহে বাধা ও ই-কমার্সের মাধ্যমে পণ্য বিতরণে সমস্যার কারণে উদ্যোক্তারা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। বিদেশি অর্ডার কমে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে, যা এসএমই খাতের জন্য উদ্বেগজনক।’

দেশে ১ কোটি এসএমই উদ্যোক্তা

এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, দেশে এসএমই উদ্যোক্তা ১ কোটির ওপরে। এ খাতে প্রায় ৩ কোটি মানুষ জড়িত। জাতীয় অর্থনীতিতে (জিডিপি) এ খাতের অবদান প্রায় ২৮ শতাংশ। যুদ্ধের কারণে পুরো খাতটি এখন টিকে থাকার লড়াই করছে।

খাতটির গুরুত্ব তুলে ধরে এসএমই ফাউন্ডেশনের এমডি আনোয়ার হোসেন চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ এসএমই উদ্যোক্তা রয়েছে এবং প্রায় ৩ কোটি ৭ লাখ মানুষ সরাসরি এই খাতে নিয়োজিত। জাতীয় অর্থনীতিতে এ খাতের অবদান প্রায় ২৮ শতাংশ। এত বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা খাত গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।’

আরও পড়ুন
গরম পড়তেই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে আইপিএস
টানা ৮ মাস ধরে সুখবর নেই রপ্তানি আয়ে
তেলের অভাবে মিলছে না গাড়ি, মাঠেই পড়ে থাকছে স্ট্রবেরি
দামের চেয়ে দুষ্প্রাপ্যতা বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে

উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি ও ক্রয়াদেশ কমায় উদ্বিগ্ন উদ্যোক্তারা

অর্গানিক কসমেটিক্সের প্রতিষ্ঠান ‘রিবানা’। ২০২৫ সালে জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার পেয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা মো. ওয়াহিদুজ্জামান। বর্ষসেরা এই উদ্যোক্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে ধীরে ধীরে সব কিছুর দাম বাড়ছে- প্যাকেজিং, পলিথিন ও প্রিন্টিংসহ সবকিছুর। প্রতি সপ্তাহেই একটু একটু করে দাম বাড়ছে। এতে ছোট ব্যবসায়ীরা বড় চাপের মধ্যে পড়ছে, কারণ আমরা সাধারণত কম দামে পণ্য বিক্রি করে সেল ধরে রাখতে চাই।’

ইউরোপীয় অর্ডার আগের মতো আসছে না জানিয়ে ব্যাগ, হোম ডেকর ও হস্তশিল্প পণ্য প্রস্তুত এবং বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান আহ্লাদ ফ্যাশনসের কর্ণধার জুয়েনা ফেরদৌসে জাগো নিউজকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে রপ্তানি অর্ডার কমে গেছে। ইউরোপিয়ান বায়ারদের অর্ডার আগের মতো আসছে না। দেশীয় বাজার ছোট হওয়ায় শুধু স্থানীয় বাজার দিয়ে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা ছোট করতে বাধ্য হচ্ছেন।’

৭টায় দোকান বন্ধ ও বৈশাখী মেলা নিয়েও উদ্বেগ উদ্যোক্তাদের

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রতিষ্ঠান অর্লিনস লেদারস অ্যান্ড ফুটওয়্যারের এমডি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাহমিনা আক্তার শাম্মী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের হাজারীবাগ ও লেক সিটির শোরুম- দুই জায়গায়ই একই অবস্থা। সন্ধ্যা ৭টার পরে দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছি। দোকান ভাড়া, স্টাফদের বেতন, ফ্যাক্টরি খরচ- সবকিছু চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

এসএমই ফাউন্ডেশনের বৈশাখী মেলা আয়োজন নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এসএমই মেলা আয়োজন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ৭টার পর মেলা চালানো যাবে না- এমন পরিস্থিতিতে আয়োজকরাও সিদ্ধান্তহীনতায় আছে। আমরা স্টল ভাড়া দিচ্ছি, কিন্তু মানুষ না এলে সেই খরচ ওঠানো কঠিন হবে।’

এ বিষয়ে এসএমই ফাউন্ডেশনের এমডি আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘মেলা আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা নেই। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৭টা পর্যন্ত তো মেলা চলবেই। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি বরাতে জানতে পেরেছি রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত নাকি মেলা চালানো যাবে। যদি সেটি না যায়, তবে মেলা ৭টা পর্যন্ত তো চলবেই। আগামী ১২ এপ্রিল বাংলাদেশ চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শুরু হতে যাওয়া এই মেলা চলবে সাতদিন। ফলে এটি নিয়ে উদ্যোক্তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।’

আরও পড়ুন
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে কমছে রপ্তানি আদেশ, বাড়ছে ব্যয়
দেশি পেট্রোল উৎপাদনেও লাগে বিদেশি অকটেন
আলু-পেঁয়াজের মাঠে ‘হাসি’, কৃষকের ঘরে ‘কান্না’
এখনই বড় পরিবর্তন নয়, জ্বালানি সাশ্রয়েই জোর সরকারের

যা বলছেন খাতসংশ্লিষ্ট নেতারা

জানতে চাইলে জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সমিতি, বাংলাদেশের (নাসিব) সভাপতি মির্জা নূরুল গণী শোভন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এসএমই খাত এখন গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। করোনা পরবর্তীসময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় শিল্পখাতে চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে তেলের সংকট বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে।’

‘বিদ্যুৎ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে শিল্প কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়বে। এসএমই খাত মূলত বিদ্যুৎনির্ভর। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলো প্রথমেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হচ্ছে, যা উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্য কেনায়ও এখন সংযত আচরণ করছে, ফলে ব্যবসায়ীরা বিক্রিতে ধাক্কা খাচ্ছেন।’ বলছিলেন মির্জা নূরুল গণী।

মন্তব্য জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২৪ সাল থেকে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকটের ধকল না কাটতেই চলমান যুদ্ধের প্রভাবে দেশের এসএমই খাত আজ বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, কাঁচামালের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হওয়ার কারণে বেশিরভাগ এসএমই প্রতিষ্ঠান তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।’

‘যুদ্ধের কারণে শিপিং ও ফ্রেইট খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং আমদানিতে বিলম্ব হওয়ায় টেক্সটাইল ও প্লাস্টিকসহ উৎপাদনশীল খাতগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে এসএমইদের উৎপাদন সক্ষমতা ও গ্রাহক সংখ্যা প্রতিনিয়ত কমছে। পাশাপাশি মুনাফা হ্রাস ও নতুন করে জ্বালানি সংকটের জেরে এ খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রায় থমকে গেছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা হ্রাস এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রেমিট্যান্সপ্রবাহ কমে যাওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা স্থানীয় বাজারের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে এসএমইগুলোর টিকে থাকার লড়াই আরও কঠিন করে তুলছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’ যোগ করেন তাসকীন আহমেদ।

ইএইচটি/এমএমএআর/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।