বগুড়ায় নিখোঁজ ২৪ জনের মধ্যে ৬ জন জঙ্গি সন্দেহের তালিকায়
বগুড়ার কয়েকটি উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ২৪ জন তরুণ ও যুবক দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মতো পরিবারের সদস্যরাও জানেন না তাদের অবস্থান। তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, নিখোঁজদের সবাই জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত নন। এদের মধ্যে ছয়জনের বিষয়ে সন্দেহ করা হচ্ছে যে, তাদের জঙ্গি তৎপরতা থাকতে পারে।
গুলশান ও শোকালিয়া ট্র্যাজেডির পর সম্প্রতি পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে এমনই তথ্য উঠে এসেছে।
গোয়েন্দা পুলিশের হাতে রয়েছে এই তালিকা। তারা তালিকাটি যাচাই-বাছাইয়ের পর জানিয়েছেন নিখোঁজের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
পুলিশের এই গোপন তালিকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ১৬ জুলাই সকাল পর্যন্ত ২৪ জনের মধ্যে ১৭ জন তরুণ দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে বগুড়া সদরের চারজন, গাবতলীর তিনজন, শিবগঞ্জের চারজন, শাজাহানপুরের তিনজন এবং নন্দীগ্রামের তিনজন রয়েছেন। এছাড়া নিখোঁজ হওয়া এই তালিকার বাকিদের মধ্যে সাতজন জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে তদন্তের স্বার্থে নিখোঁজদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হয়নি সূত্রটি।
বগুড়া পুলিশের ডিএসবি (ডিস্ট্রিক স্পেশাল ব্রাঞ্চ) অফিস সূত্র জানায়, জেলায় জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িতদের নাম-পরিচয় পেতে এলাকার জনপ্রতিনিধি, কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির নেতা, চৌকিদার ও গ্রাম পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিস্ট্রিক স্পেশাল ব্রাঞ্চ) মনিরা সুলতানা জানান, সম্প্রতি বগুড়া থেকে সন্দেহজনকভাবে দুই তরুণ নিখোঁজ হয়। এদের একজন হলো ধুনট উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের পীরাহাটি গ্রামের আবু মোত্তালেব মজনু। মাস দেড়েক হলো সে নিখোঁজ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মজনু আফগান যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। আফগানফেরত এই মজনু জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার বাংলাদেশ শাখার সদস্য বলেও স্থানীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। অতীতে ঢাকায় রমনা বটমূলে বোমা হামলার ঘটনায় মজনু ঢাকায় গ্রেফতার হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে ছাড়া পায় সে।
নিখোঁজ মজনুর বড় ভাই রেজাউল হক মিন্টু জানিয়েছেন, জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর সে রাজশাহীতে বিয়ে করে সেখানেই রয়েছে। তবে পুলিশ সেই ঠিকানায় মজনুকে পায়নি। এ ছাড়া ধুনটে নিখোঁজ আরেকজন হলো আব্দুস সালাম। তার বাড়ি ধুনটের চৌকিবাড়ি ইউনিয়নের পেঁচিবাড়ি গ্রামে। ১৯৯০ সালে আফগান যুদ্ধের জন্য সে প্রশিক্ষণ নেয়। প্রায় এক যুগ আগে সে নিখোঁজ হয়। আজ পর্যন্ত তার খোঁজ মেলেনি। অনেকে বলছেন, সালাম কারাগারে। তার স্ত্রী ও মেয়ে নিজ বাড়ি ছেড়ে শেরপুরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। তার নিখোঁজ ঘটনায় থানায় জিডি হয়নি।
ধুনটের নিখোঁজ তৃতীয় জনের নাম শাহ আলম। তার বাড়ি ধুনট উপজেলায় তারাকান্দি গ্রামে। বাবার নাম মৃত অবির উদ্দিন শেখ। শাহ আলম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র ছিল। ২০০৩ সাল থেকে সে নিখোঁজ। তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ২০০৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় রমনা থানার জিডি করেছিলেন তার ভাই গোলাম রব্বানী।
ধুনট থানা পুলিশের ওসি মিজানুর রহমান জানান নিখোঁজ শাহ আলমের খোঁজখবর নিয়ে তার আত্মীয়স্বজনসহ ভাই-বোনদের কাছ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
দুপচাঁচিয়া থানা পুলিশের ওসি নজরুল ইসলাম জানান, মেরাই গ্রামের শাহীনুর নিখোঁজ রয়েছে। সে প্রায় ছয় মাস আগে বাড়িতে এসেছিল। এরপর থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে থানায় জিডি করা হয়নি। শাহীনুরের সঙ্গে জঙ্গি তৎপরতার সম্পৃক্ত রয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে মনে হয়েছে।
নন্দীগ্রাম থানা পুলিশের ওসি হাসান শামীম ইকবাল জানান, তার থানা এলাকায় নিখোঁজ তিনজনের মধ্যে দুজন নারী। তবে রণবাঘা গ্রামের সবদেব চন্দ্র কর্মকারের ছেলে জুয়েলারি শ্রমিক গোপাল চন্দ্র কর্মকার। এর মধ্যে গোপাল জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
বগুড়ার বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মোন্নাফ জানান, শহরের জামিলনগরের বাসিন্দা ও সরকারি আযিযুল হক কলেজের ছাত্র রাগিবুল হাসান রিগ্যান এক বছর ধরে নিখোঁজ। তার সঙ্গে নিখোঁজ বন্ধু মাসুদ ঢাকার কামরাঙ্গীরচর থেকে সম্প্রতি গ্রেফতার হয়েছে। মাসুদ জঙ্গি হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, রিগ্যানও জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। রিগ্যানের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
বগুড়া গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, বগুড়ায় এভাবে জঙ্গি বিস্তার তারা কখনো ভাবতে পারেনি। জেলা বিশেষ শাখার কাছেও এ ধরনের আগাম কোনো তথ্য ছিল না। এ কারণে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। গুলশান হামলায় বগুড়ার নিহত জঙ্গি খায়রুল ইসলাম পায়েলের বন্ধু আবদুল হাকিম এখন নিখোঁজ। তার বাড়িও শাজাহানপুরের চুপিনগর ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামে। সে জঙ্গি তালিকাভুক্ত নয়। স্বজনরা বলছেন, হাকিম আজারবাইজানে চলে গেছে। এই গ্রাম থেকে গত ২৭ এপ্রিল একে-২২ রাইফেল, একটি পিস্তল ও ৫২ রাউন্ড গুলিসহ গ্রেফতার হন জেএমবি ইসাবা গ্রুপের সদস্য আবদুল মোমিন। মোমিন গত বছরের নভেম্বরে শিবগঞ্জের শিয়া মসজিদে হামলায় জড়িত ছিল।
গত ৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় বগুড়ার শেরপুরের জুয়ানপুর কুঠিরভিটা গ্রামের মাহবুব আলমের বাসায় তৈরির সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেএমবির সামরিক শাখা প্রধান রাইসুল ইসলাম খান ওরফে ফারদিন ও জঙ্গি তরিকুল ইসলাম জুয়েল নিহত হয়। আজও বাড়ির ভাড়াটিয়া কথিত সিএনজি চালক মিজানুর রহমানকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের ধারণা মিজানুরও জঙ্গি।
তবে পুলিশ শাজাহানপুরের কামারপাড়ার বাড়ি থেকে ফারদিনের স্ত্রী ও আবদুল বাকীর মেয়ে জেএমবি নারী ইউনিটের নেত্রী মাসুমা আকতারকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। মাসুমার ভাই মোজাহিদও জেএমবির সক্রিয় সদস্য। মোজাহিদ জেএমবির শীর্ষ নেতা বাংলাভাইয়ের সঙ্গে ফাঁসিতে মৃত বাগমারার জঙ্গি মামুনের আপন ভগ্নিপতি। তার অপর ভাই মোস্তাফিজার রহমান ওরফে বোমা শাকিলও জেএমবির জঙ্গি সদস্য। এই তথ্যগুলো পুলিশের হাতে থাকলেও এরা সকলেই এখানো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে , নিখোঁজ এমন অনেক তরুণ রয়েছে, যাদের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে এই চিহ্নিত জঙ্গিদের যোগাযোগ হয়েছে।
বগুড়ার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার গাজিউর রহমান জানান, জঙ্গি ও নিখোঁজ তরুণ-যুবকের সন্ধান পেতে চৌকিদার, গ্রাম পুলিশ, কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম এবং জনপ্রতিনিধিদের অনুরোধ করা হয়েছে।
বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, বগুড়ায় নিখোঁজ তরুণ-যুবকদের তালিকা এখন তাদের হাতে। এখন পুলিশ এসব নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। আশা করা হচ্ছে অচিরেই সব কিছু সমাধান করা যাবে।
লিমন বাসার/এমএএস/আরআইপি