টঙ্গীতে ত্রিভুজ প্রেমের জেরে বাবা-ভাইকে খুন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি গাজীপুর
প্রকাশিত: ০৭:৫৫ এএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
এআই দিয়ে বানানো ছবি

গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গী পূর্ব থানার উত্তর বনমালা এলাকায় নিজ ঘর থেকে ছেলের ও পাশের রেল লাইনের পাশ থেকে বাবার মরদেহ উদ্ধার ও হত্যার ঘটনায় মূল রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ।

এক খালাতো বোনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ত্রিভুজ প্রেমের জেরে বড় ভাই সাইফুর রহমান সোহান (২৮) এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

নিহত সোহেল রানার বড় ছেলে সাইফুর রহমান সোহানের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে এসেছে লোমহর্ষক তথ্য। পরে তাকে আদালতের নির্দেশে হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

গাজীপুরের মহানগর হাকিম জুবায়ের রশিদের আদালতে সোহান সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকেলে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এতে তিনি স্বেচ্ছায় নিজের দায় স্বীকার করে হত্যার কারণ বর্ণনা করেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (অপরাধ-দক্ষিণ) মহিউদ্দিন আহমেদ।

তিনি জানান, ঘটনার পর সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনার পারস্পরিকতা, সোহানের আচরণ ইত্যাদি পর্যালোচনা করে ঘটনার পর পরই তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

আদালতে দেওয়া বড় ভাই সাইফুর রহমান সোহানের জবানবন্দি অনুযায়ী, সোহানের সঙ্গে তার এক খালাতো বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। তবে সোহানের চেয়ে ১০ বছরের বড় হওয়া সত্ত্বেও ওই তরুণীর সঙ্গে গোপনে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন ছোট ভাই সাকিবুর রহমান (১৮)। বিষয়টি জানাজানি হলে দুই ভাইয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ ও ক্ষোভ তৈরি হয়। গত শনিবার রাতে এ নিয়ে পুনরায় কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

সূত্র জানায়, ঘটনার রাতে পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সোহান তার ছোট ভাই সাকিবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাকিবের মুখ চেপে ধরে এবং হাত-পা বেঁধে ধারালো ব্লেড দিয়ে হাত ও পায়ের রগ কেটে দেয় সোহান। মৃত্যু নিশ্চিত করার পর সে সাকিবের বাঁধন খুলে দিয়ে ঘটনাটি স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করে।

সূত্র আরও জানায়, হত্যাকাণ্ড চলাকালীন পাশের কক্ষে থাকা বাবা সোহেল রানা (৫০) বিষয়টি দেখে ফেলেন। আতঙ্কিত সোহান তখন বিষয়টি ধামাচাপা দিতে একজন সহযোগীকে সাথে নিয়ে তার বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে বনমালা রেললাইনে নিয়ে যায়।
সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে সেই দৃশ্য। অন্ধকারে দুইজন ব্যক্তি একজন দুর্বল মানুষকে ধরে রেললাইনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন, সেই ব্যক্তি ছিলেন সোহেলের বাবা।

ফুটেজে আরও দেখা যায়, রেললাইনের ওপর তাকে ফেলে রেখে দ্রুত সরে যায় তারা। কিছু সময় পর ট্রেনের নিচে পড়ে মৃত্যু হয় তার। এটি দুর্ঘটনা না পরিকল্পিত হত্যা-তা নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে।

গত রোববার (২৬ এপ্রিল) ভোররাতে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীর উত্তর বনমালা এলাকায় বাবা ও ছেলের রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। নিজ ঘর থেকে ছোট ছেলের মরদেহ এবং পার্শ্ববর্তী রেললাইন থেকে বাবার মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত সোহেল রানার বোন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেন।

নিহত বাবার নাম সোহেল রানা। তিনি মহানগরীর টঙ্গীর উত্তর বনমালা এলাকার মোস্তফা দর্জির ছেলে। অপরজন, নিহত সোহেল রানার ছেলে সাকিবুর রহমান শোয়েব (১৭)। তিনি ঢাকার উত্তরা আনোয়ারা মডেল ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ নিহত সোহেল রানার বড় ছেলে সাইফুর রহমান সোহানকে আটক করেছিল। ঘটনার পর থেকেই সোহানের আচরণ ছিল রহস্যজনক। ঘটনার পর সোহান পালিয়ে যায়নি, বরং স্বজনদের ফোন করে হত্যার খবর জানাতে থাকে। কিন্তু তার ফোনকলের সময়, বক্তব্য এবং বাস্তব ঘটনার মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া যায়।

তদন্তকারীদের মতে, এটি ছিল ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা, যেন সন্দেহ অন্যদিকে ঘুরে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রমাণের কাছে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (অপরাধ-দক্ষিণ) মহিউদ্দিন আহমেদ জানান, ত্রিভুজ প্রেমের কারণে প্রতিশোধ নিতে বড় ভাই একাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

মো. আমিনুল ইসলাম/এমআরএম/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।