হাইকমিশনের উদ্যোগ

মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সম্ভাবনা

আহমাদুল কবির
আহমাদুল কবির আহমাদুল কবির , মালয়েশিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৯:৩৫ এএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
মিনিস্টার অব ইনভেস্টমেন্ট, ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি দাতুক সেরি জোহারি আব্দুল গানির সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য- বিনিয়োগ স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে যে সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা সময়ের সঙ্গে আরও সুদৃঢ় হয়েছে।

বর্তমানে এই সম্পর্ক শুধু আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হয়েছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণে এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কে গতিশীলতা আনতে কাজ করে চলেছে মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন।

বিশ্ব বাণিজ্যে মালয়েশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান অঞ্চলে এটি অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র বা ‘হাব’ হিসেবে বিবেচিত। এই অবস্থানের কারণে মালয়েশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়ন বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

jagonews24মিনিস্টার অব ইনভেস্টমেন্ট, ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি দাতুক সেরি জোহারি আব্দুল গানির সঙ্গে দুই দেশের বাণিজ্য- বিনিয়োগ স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এই অর্জন দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা ও সম্ভাবনার প্রতিফলন।

jagonews24কুচিংয়ে প্রিমিয়ারের কার্যালয়ে সারাওয়াকের প্রিমিয়ার আবাং হাজি আব্দুর রহমান যোহারি বিন তুন আবাং হাজি ওপেং-এর সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী, বৈঠকে দুই পক্ষ কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং শ্রমিক অভিবাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করেন

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ধারাবাহিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে যা বাংলাদেশের জন্যও আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল প্রায় ২.৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মার্চ পর্যন্ত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রবণতা একই রকম লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

jagonews24মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী দাতুক সেরি আর রামাননের সাথে বৈঠক করেন হাইকমিশনার। বৈঠকে দুপক্ষের মধ‍্যে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের কর্মী নিয়োগসহ বাংলাদেশি প্রবাসীদের সার্বিক কল‍্যাণ নিশ্চিতকরণ এবং মানব সম্পদ ব‍্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করেন

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মালয়েশিয়ায় রপ্তানির পরিমাণ ২৮২.৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার পক্ষান্তরে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানির পরিমাণ ছিল ২.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ হতে মালয়েশিয়ায় রপ্তানির পরিমাণ ২৩৪.৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে, নতুন পণ্য রপ্তানির তালিকায় যুক্ত হচ্ছে এবং রপ্তানি সক্ষমতা শক্তিশালী হচ্ছে।

মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের তালিকায় বৈচিত্র রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী রপ্তানি করা উল্লেখযোগ্য পণ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক (নিটওয়্যার ও ওভেন গার্মেন্টস), শাকসবজি ও আলু, ড্রাই ফুড, ময়দা ও দুধ থেকে তৈরি সামগ্রী, জুস/পানীয়, স্পিরিট এবং ভিনেগার, চামড়া ও চামড়া জাতপণ্য, রাবার/রাবার জাতপণ্য, মশলা ও ওষুধপণ্য। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত এই বাণিজ্যের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান মালয়েশিয়ার বাজারেও সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

jagonews24মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী দাতুক সেরি আর রামাননের সাথে বৈঠক করেন হাইকমিশনার। বৈঠকে দুপক্ষের মধ‍্যে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের কর্মী নিয়োগসহ বাংলাদেশি প্রবাসীদের সার্বিক কল‍্যাণ নিশ্চিতকরণ এবং মানব সম্পদ ব‍্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা করেন

শুধু শিল্পপণ্য নয়, কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে হালাল খাদ্যপণ্যের বিশাল বাজার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা। হাইকমিশনের সহায়তায় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো মালয়েশিয়ান হালাল সার্টিফিকেশন এর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে রপ্তানি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সম্প্রতি হালাল ইকোসিস্টেমের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতাধীন হালাল বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের মধ্যে একটি কূটনৈতিক নোট বিনিময় হয়েছে যার মাধ্যমে একটি হালাল অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার সহায়তা চেয়েছে, যা হালাল খাতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং এ সংক্রান্ত বৈশ্বিক মানকে সংযুক্ত করবে।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগ, রাজ্য সরকার, ব্যবসায়িক চেম্বার এবং বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিতভাবে নেটওয়ার্কিং সভা এবং মতবিনিময়ের আয়োজন করে যেখানে বাংলাদেশের বাণিজ্য সুবিধা এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।

এছাড়া হাইকমিশন বাংলাদেশি রপ্তানিকারক ও মালয়েশিয়ান আমদানিকারকদের মধ্যে বিজনেস ম্যাচমেকিং ও নেটওয়ার্কিং আয়োজন এবং বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে নিয়মিতভাবে বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হালাল অর্থনীতি, পর্যটন, খাদ্য ও পানীয়, উপহার সামগ্রী এবং যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হাইকমিশন মালয়েশিয়ায় চৌদ্দটি (১৪)টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করেছে।

jagonews24হাইকমিশনার মালয়েশিয়ান ম্যানুফ্যাকচারিং ফেডারেশন (এফএমএম) এবং সারাওয়াক বিজনেস ফেডারেশন (এসবিএফ)-এর সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করেন,যেখানে বাংলাদেশ ও সারাওয়াকের মধ্যে পারস্পরিক সুবিধাজনক ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন

এই মেলাগুলোয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে রপ্তানিপণ্যের বহুমুখীকরণসহ মালয়েশিয়া তথা আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার তৈরি ও সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৬ সালে সেমিকন্ডাক্টর, ওষুধশিল্প, তৈরি পোশাক, হালাল অর্থনীতি, খাদ্য ও পানীয় ও পর্যটন বিষয়ে অন্তত ছয়টি মেলায় অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে হাইকমিশনের।

২০২৫ সালে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া বিজনেস ফোরাম অনুষ্ঠিত হয় যেখানে মালয়েশিয়ার শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশকে একটি স্বল্প-ব্যয়বহুল বাজারের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগের গন্তব্য হিসাবে বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়।

এছাড়াও বাংলাদেশের তরুণ এবং সৃজনশীল জনগোষ্ঠীর সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে মালয়েশিয়ান বিনিয়োগকারীদের ম্যানুফেকচারিং, জ্বালানি, হালাল শিল্প এবং সার্ভিস সেক্টরে বিনিয়োগের যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের জন্য এবং প্ল্যাটফর্ম হিসাবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। চলতি ২০২৬ সালেও বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগে বিজনেস ফোরাম আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মালয়েশিয়া বাংলাদেশে নবম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ এবং বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৫৫.৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাময়। দু্ই বন্ধুপ্রতিম দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারত্বে রূপান্তরিত করতে হালাল বাণিজ্য, ডিজিটাল অর্থনীতি, জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ সম্ভাবনা, জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে উভয়দেশ নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

তবে ইতিবাচক প্রবণতার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ভারসাম্যের অসামঞ্জস্য, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা। এসব সমস্যা সমাধানে হাইকমিশন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করছে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে।

পাশাপাশি বাণিজ্য সহজীকরণে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাও অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা দূরীকরণে ওষুধ, ব্যাটারি, চামড়া জাত পণ্য, সিরামিক এবং পাটের মতো পণ্যের জন্য মালয়েশিয়ার বাজারে সহজ প্রবেশাধিকারের অনুরোধ জানিয়ে আসছে এবং দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে নেগোসিয়েশন শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে।

এমআরএম

 

প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা, ভ্রমণ, গল্প-আড্ডা, আনন্দ-বেদনা, অনুভূতি, স্বদেশের স্মৃতিচারণ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেখা পাঠাতে পারেন। ছবিসহ লেখা পাঠানোর ঠিকানা - [email protected]