এবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?

কামাল হোসেন কামাল হোসেন , জেলা প্রতিনিধি নেত্রকোনা
প্রকাশিত: ১২:১৫ পিএম, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
ভারী বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে হাওরের অনেক কৃষকের ধান/ছবি-জাগো নিউজ

‘সবকটা হাওরে বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে লেগে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। যেগুলো ভাসা ছিল, তাও ডুবতে শুরু করেছে। এখন চোখে শুধু অন্ধকার দেখি। কেমনে ঋণ দেব, কেমনে বউ-বাচ্চা লইয়া খাইবো? চিন্তায় ঘুম ধরে না।’

গভীর হতাশার সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন নেত্রকোনার খালিয়াজুরি উপজেলার গাজিপুর ইউনিয়নের পাঁচহাট গ্রামের কৃষক জলিল মিয়া। তার মতো হাওরের অনেক কৃষকের ধান অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে। অবশিষ্ট ধানও কেটে ঘরে ‍তুলতে পারবেন কি-না, তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।

অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন হাওরের কৃষকরা। বৈরী আবহাওয়া, হাওরে পানির চাপ, বজ্রপাত আতঙ্কের মধ্যে ধান কাটা শ্রমিকের সংকটসহ নানা কারণে সংকট গভীরতর হয়েছে।

সোমবার রাত ও মঙ্গলবার ভারী বৃষ্টিতে অনেক হাওরের জমির ধান তলিয়ে গেছে। পানি বেড়ে যাওয়ায় অনেকের শুকানোর খলায় রাখা ধানও নষ্ট হয়ে গেছে। হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধগুলোও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

‘নেত্রকোনায় সবকটা নদ-নদীর পানি বেড়েছে। আগামী দুদিনও অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। একই সঙ্গে নেত্রকোনার উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে উজানে পাহাড়ি ঢল নামবে। হাওরের জন্য আগামী দুদিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এরপর পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা হচ্ছে’

নেত্রকোনায় গত ২৪ ঘণ্টায় মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে। সোমবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) সকাল ৯টা পর্যন্ত ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে উজান থেকে নামছে পাহাড়ি ঢল। এতে হাওর ও নদীতে পানি বেড়ে কৃষকের চোখের সামনেই জমির পাকা ধান তলিয়ে যাচ্ছে। পানির চাপে যে কোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জেলার ঝাঞ্জাইল এলাকার কংস নদে বিপৎসীমার ২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

এবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?
পানিতে তলিয়ে গেছে অনেক ধানক্ষেত/ছবি-জাগো নিউজ

খালিয়াজুরী উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন পর্যন্ত হাওরের ৫৪ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। এখনো প্রায় অর্ধেক জমির ধান কাটা বাকি। সবকিছুই এখন প্রকৃতির ওপর নির্ভর করছে।

‘পরিস্থিতি ভালো নয়। চোখের সামনে অনেক কৃষকের ধান তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা কাঁদছেন। অনেক কৃষক আধা ভাগিতেও ধান কাটা শ্রমিক পাচ্ছেন না। হাওরে কৃষকের অসহায়ত্ব দেখার কেউ নেই। সত্যিকার অর্থে কৃষকের পাশে কেউ নেই’

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনায় সবকটা নদ-নদীর পানি বেড়েছে। আগামী দুদিনও অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। একই সঙ্গে নেত্রকোনার উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতেও অতিভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে উজানে পাহাড়ি ঢল নামবে। হাওরের জন্য আগামী দুদিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এরপর পরিস্থিতির উন্নতির আশা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন:
আগাম বন্যার শঙ্কায় কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ
‘বাপুরে, ১০০ মণ ধান পেতাম এখন এক মণও পামু না’
চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টি: হাওরে বন্যার শঙ্কায় ধান কাটার পরামর্শ পাউবোর
সারাদেশে টানা চার দিন বৃষ্টির আভাস

জেলার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দার আংশিক এলাকা মূলত হাওরাঞ্চল। হাওরের একমাত্র ফসল বোরোর ওপরই নির্ভর করে কৃষকদের সারা বছরের সংসার খরচ, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়ালেখা ও আচার অনুষ্ঠান। জেলায় ছোট-বড় মোট ১৩৪টি হাওরের মধ্যে খালিয়াজুরিতে রয়েছে ৮৯টি। আগাম বন্যা থেকে হাওরের ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৮ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ দেওয়া হয়। পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব বাঁধে ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি টাকা। এসব বাঁধের ওপর স্থানীয় কৃষকদের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির রোরো ফসল নির্ভর করে।

এবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?ডুবে যাওয়া ধানক্ষেতে কাজ করছেন ভুক্তভোগী কৃষক/ছবি-জাগো নিউজ

স্থানীয় কৃষকরা জানান, হাওরের প্রায় অর্ধেক ধান এখনো পাকেনি। ধান রোপণের সময় হাওরে পানি থাকায় রোপণ করতে কিছুটা দেরি হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি কম হওয়ায় ধান পাকতে দেরি হচ্ছে। আবার অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে কম্বাইন হারভেস্টার দিয়েও ধান কাটতে সমস্যা হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে ডিজেল ও শ্রমিক সংকট।

‘হাওরের জমিতে ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে সেগুলো জমিতে রাখা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। জেলায় আগেও ভারী বৃষ্টি হয়েছে। এমনিতে হাওরের বৃষ্টির পানিতে জলাবন্ধতা রয়েছে। এখন উজানের ঢল নামলে পানি আরও বাড়বে। তাই দ্রুত পাকা ধান কাটতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে’—পাউবো কর্মকর্তা

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক দিনে উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও উজানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে। ২৭ এপ্রিল মাঝারি থেকে ভারী এবং ২৮-৩০ এপ্রিল ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। এতে ধনু, বৌলাই ও কংস নদের পানি বাড়তে পারে। ২৮ এপ্রিল থেকে কোথাও কোথাও নদ-নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।

মোহনগঞ্জ উপজেলার গাগলাজুর এলাকার কৃষক মানিক সরকার। সোমবার দিনেও জমিতে পাকা ধান রেখে গেছেন। কিন্তু রাতের বৃষ্টিতে সর্বনাশ হয়ে গেছে। মঙ্গলবার সকালে এসে দেখেন, জমির সব ধান তলিয়ে গেছে। সাত বিঘা জমির মধ্যে মাত্র এক বিঘা জমির ধান তুলতে পেরেছেন। কিন্তু সেগুলোও রোদ না থাকায় শুকানো যাচ্ছে না।

খালিয়াজুরি উপজেলার কীর্তনখলা হাওরপাড়ের কৃষক কুদ্দুস মিয়া জানান, বন্যার আশঙ্কার কথা শুনে তার জমির সব ধান কেটে ফেলেছেন। এর মধ্যে কিছু আধাপাকা ধানও ছিল। সেগুলো এখনো মাড়াই করেননি। মাড়াইয়ের পর ধান না শুকালে নষ্ট হয়ে যাবে।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘পানিতে তলিয়ে যাওয়ার থাকি, এখন যা পাই তা-ই ভালো। এর লাগি আর পাকার অপেক্ষা করছি না।’

একই উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক শাহিন মিয়া জানান, তাদের এলাকায় হাওরের খলাতে অনেক কৃষকের ধান রাখা ছিল। সকালে উঠে অনেকে দেখেন, সেই ধানে পানি উঠে গেছে।

এবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?ডুবে যাওয়া ধানক্ষেতে কাজ করছেন ভুক্তভোগী কৃষক/ছবি-জাগো নিউজ

স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, টানা বৃষ্টিতে অনেক হাওরে আগেই জলাবদ্ধতা ছিল। অনেক ধানের ক্ষতি হয়েছে। এখন ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। ধান কাটা-মাড়াই, শুকানোর সুবিধা নেই। এর মধ্যে ধান কাটা শ্রমিকের সংকট আছে। ধানের মায়ায় বন্যা, ভারী বৃষ্টি আর বজ্রপাত আতঙ্ক মাথায় নিয়ে হাওরে যাচ্ছেন তারা। কিন্তু বৈরী আবহাওয়ার কারণে খুব একটা সুবিধা করতে পারছেন না তারা।

কলমাকান্দা হাওররক্ষা আন্দোলনের নেতা মো. নুরুল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘পরিস্থিতি ভালো নয়। চোখের সামনে অনেক কৃষকের ধান তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা কাঁদছেন। অনেক কৃষক আধা ভাগিতেও (অর্ধেক ভাগ) ধান কাটা শ্রমিক পাচ্ছেন না। হাওরে কৃষকের অসহায়ত্ব দেখার কেউ নেই। সত্যিকার অর্থে কৃষকের পাশে কেউ নেই।’

বাঁধ রক্ষায় পাহারা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে নেত্রকোনার হাওর-নদীতে পানি বাড়ছে। হাওরের বিভিন্ন ফসল রক্ষা বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখন যে কোনো সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙে ফসলহানি হতে পারে। তাই সব বাঁধে পাহারার ব্যবস্থা করার জন্য সব প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) লোকজনকে নির্দেশ দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাদির হোসেন শামীম।

তিনি বলেন, ‘ধনু নদে পানি কিছুটা বেড়েছে। কিছু কিছু নিচু এলাকার ধানক্ষেতে পানি জমেছে। হাওরের পাকা ধান দ্রুত কেটে ফেলতে মাইকিং করে কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ডিজেলের সংকট উত্তরণে চেষ্টা করা হচ্ছে। ফসল ঘরে তুলতে তদারকি করা হচ্ছে।’

এবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?ক্ষেতে ধান কাটায় ব্যস্ত কৃষকরা/ছবি-জাগো নিউজ

নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, নদ-নদীর পানি বেড়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করে হাওরে ঢুকে পড়তে পারে। ফলে বন্যার আশঙ্কা আছে।

আরও পড়ুন:
পানির নিচে ১০ হাজার বিঘা জমির ধান, দিশেহারা হাওরের হাজারো কৃষক
বন্যার আগে বৃষ্টিতেই তলিয়ে গেছে হাওরের ধান
বন্যার শঙ্কায় আধা পাকা ধান কাটছেন হাওরপাড়ের চাষিরা
হাওরে কৃষকের ওপর নতুন ‘জুলুম’, ৪৫ কেজিতে ধানের মণ!

তিনি বলেন, ‘হাওরের জমিতে ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে সেগুলো জমিতে রাখা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। জেলায় আগেও ভারী বৃষ্টি হয়েছে। এমনিতে হাওরের বৃষ্টির পানিতে জলাবন্ধতা রয়েছে। এখন উজানের ঢল নামলে পানি আরও বাড়বে। তাই দ্রুত পাকা ধান কাটতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, জেলায় এক লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন ধান। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ মেট্রিক টন। সোমবার বিকেল পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘ধনু নদে পানি কিছুটা বাড়লেও এখনো হাওর নিরাপদ আছে। কৃষকরা যাতে নির্বিঘ্নে ফসল কাটতে পারেন, সেজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশাপাশি আমরা বাঁধের পিআইসি কমিটির সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলেছি। ইউএনওরা মাঠে আছেন।’

এবারও কি কপাল পুড়বে হাওরের কৃষকের?ডুবে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার ধানক্ষেত/ছবি-জাগো নিউজ

তিনি বলেন, ‘কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে জিও ব্যাগ ফেলার দরকার, সেখানে তা প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পানি বাড়লে ঝুঁকি বাড়বে, সেক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

২০১৭ সালে নেত্রকোনার হাওরে অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে সব ফসল তলিয়ে যায়। এতে হাওরের শতভাগ ফসল নষ্ট হয়ে যায়। জেলায় দেখা দেয় খাদ্য সংকট। দেশে তখন চালের দাম বেড়ে গিয়েছিল। তখন হাওরাঞ্চলের প্রায় এক লাখ কৃষক পরিবারকে টানা এক বছর খাদ্য সহায়তা দিয়েছিল সরকার।

এসআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।