অদ্ভুত স্থবিরতায় ধুঁকছে ১০ বার দেশসেরা হওয়া হাসপাতাল
• ২০২৩ সাল থেকে উদ্বোধনের অপেক্ষা
• অব্যবহৃত ভবনে ঘটছে যন্ত্রাংশ চুরির ঘটনা
• ৫০ শয্যার হাসপাতালে থাকছেন ১৫০ রোগী
একদিকে টানা ১০ বার দেশসেরা হওয়ার গৌরবময় অতীত, অপরদিকে প্রশাসনিক অবহেলায় মুখ থুবড়ে পড়া বর্তমান, এ দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে যশোরের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ১০০ শয্যায় উন্নীতের জন্য ৩৮ কোটি টাকার অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও কেবল অনুমোদনের অভাবে পূর্ণাঙ্গ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে শত শত মানুষ। ভবন আছে কিন্তু জনবল নেই, আধুনিক সরঞ্জাম থাকলেও ব্যবহারের অনুমতি নেই, এমন এক অদ্ভুত স্থবিরতায় ধুঁকছে দক্ষিণ জনপদের অন্যতম এ চিকিৎসাকেন্দ্র।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সীমান্তবর্তী চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। চৌগাছা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী ঝিকরগাছা, মহেশপুর ও কোটচাঁদপুর উপজেলার রোগীরা এখানে সেবা নিতে আসেন। প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালে ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হলেও জনবল কাঠামোর অনুমোদন না হওয়ায় কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, তা অনিশ্চিত। তবে রোগীর অতিরিক্ত চাপে ভবনটির নিচতলা ও দ্বিতীয় তলা সাময়িকভাবে ব্যবহার শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এরই মধ্যে নতুন ভবনের মূল্যবান যন্ত্রপাতি চুরির ঘটনাও ঘটেছে।
আরও পড়ুন:
খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরু
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধস
বুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল
হাসপাতালটি ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত উপজেলা পর্যায়ে টানা ১০ বার দেশসেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করে। ২০১৮ সালেও এটি জাতীয় পুরস্কার লাভ করে ও সর্বশেষ ‘হেলথ মিনিস্টার ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড-২০২০’-এ সারাদেশে প্রথম হয়।
‘২০২৩ সালে ভবন নির্মাণ শেষ হলেও জনবল কাঠামো চূড়ান্ত হয়নি। সংকট নিয়েই প্রতিদিন শতশত রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে। রোগীদের যথাযথ সেবা নিশ্চিতে দ্রুত হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা জরুরি।’
বর্তমানে হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৭০০- ৮০০ রোগী সেবা নেন। ৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ রোগী ভর্তি থাকেন, যাদের বড় একটি অংশই নারী। এ বিপুল রোগীর চাপ সামলাতেই হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীতের সিদ্ধান্ত এবং ছয় তলা বিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়।
যশোর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে তিনটি গুচ্ছে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এ অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে ২১ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে ছয় তলা মূল ভবন। ২০২১ সালের ২৯ এপ্রিল কাজ শুরু হয়ে ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর নির্মাণ শেষ হয়। এছাড়া ১৪ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের জন্য পাঁচটি আবাসিক ভবন এবং দুই কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে অক্সিজেন প্ল্যান্টসহ সরবরাহ লাইন স্থাপন করা হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্র জানায়, ভবন নির্মাণ শেষ হলেও উদ্বোধনের আগে প্রশাসনিক অনুমোদনের কাজ বাকি ছিল। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রশাসনিক অনুমোদন মিললেও এখনো পদসৃষ্টি ও জনবল কাঠামোর অনুমোদন মেলেনি। এছাড়া প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি।

এদিকে, নবনির্মিত ভবনটি দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত থাকায় জানালা-দরজাসহ বিভিন্ন আসবাব নষ্ট হতে শুরু করেছে। চুরি হয়ে গেছে বাথরুমের ফিটিংস, ট্যাপ ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্টের পাইপ। ভবনের বিভিন্ন অংশের রংও চটে যাচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, অতিরিক্ত রোগীর চাপে ভবনের আংশিক ব্যবহার শুরু হলেও রয়েছে তীব্র জনবল সংকট। বিদ্যমান ৫০ শয্যার সেবা দিতেই কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী ৩২ চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও রয়েছেন ২০ জন। যার মধ্যে আবার কয়েকজন প্রেষণে অন্য জায়গায় কর্মরত।
‘হাসপাতালটিকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রশাসনিক অনুমোদন মিলেছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও পথ্যের বরাদ্দের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে।’
এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন ডা. মৃদুল কান্তি, ডা. গোলাম রসুল, সামান্তা রহমান শান্তা এবং ডা. সঞ্চিতা সেন। অনুপস্থিত এ চারজনের মধ্যে তিনজনই দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন:
আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প
বন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্য
প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’
হাসপাতালের দুজন জ্যেষ্ঠ সেবিকা জানান, চিকিৎসক ও নার্স ছাড়াও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর তীব্র সংকট রয়েছে। চারজন মিডওয়াইফারি বদলি হলেও নতুন কেউ যোগ দেয়নি। পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নৈশপ্রহরীর সংকটে হাসপাতালের নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা বিঘ্নিত হচ্ছে।
চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানুল মিজান রুমী বলেন, ভবন নির্মাণ ২০২৩ সালে শেষ হলেও এখনো ১০০ শয্যার কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রশাসনিক অনুমোদন পেলেও জনবল কাঠামো চূড়ান্ত হয়নি। এ সংকট নিয়েই প্রতিদিন শতশত রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মাসুদ রানা বলেন, হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রশাসনিক অনুমোদন মিলেছে। জনবল ও আসবাবপত্রের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও পথ্যের বরাদ্দের বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে।
এমএন/এএইচ/এমএস