এমপির প্রভাবে গ্রামে ‌‘নির্বাসিত’ জেলা স্বাস্থ্যসেবা

আহমেদ জামিল
আহমেদ জামিল আহমেদ জামিল , জেলা প্রতিনিধি সিলেট
প্রকাশিত: ০৫:১২ পিএম, ১১ মে ২০২৬
সিলেটের দক্ষিণসুরমায় অবস্থিত জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র/ছবি-জাগো নিউজ
  • স্থানান্তরের পর রোগী কমেছে
  • অ্যানেস্থেসিস্ট না থাকায় বন্ধ অস্ত্রোপচার
  • একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটিও পরিত্যক্ত
  • নষ্ট হচ্ছে দামি দামি যন্ত্রপাতি

তিনতলা ভবন। চারপাশে ফুলের বাগান। গ্রামের নির্মল পরিবেশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির ভেতরে সুনসান নীরবতা। প্রবেশ করতেই চোখ কেড়ে নেয় চকচকে টাইলস। দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই এটি একটি হাসপাতাল। তা-ও আবার সরকারি প্রতিষ্ঠান। সিলেটের দক্ষিণসুরমা উপজেলার তেতলি ইউনিয়নের অতিরবাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটির নাম জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র।

একসময় সিলেটে স্বাভাবিক প্রসব এবং মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম নির্ভরযোগ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ছিল এটি। নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকায় ভাড়া বাসায় ছোট পরিসরে পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে গর্ভবতী নারী ও শিশু রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসতেন।

বিশেষ করে ২০০২-২০০৩ সালের দিকে যখন সিজারিয়ান প্রসবের হার তুলনামূলক কম ছিল, তখন স্বাভাবিক প্রসবের জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে এই কেন্দ্রটি ছিল সাধারণ মানুষের বড় ভরসা। সীমিত অবকাঠামো হলেও সেবার মান ও সহজ যাতায়াতের কারণে রোগীদের আস্থা ছিল প্রতিষ্ঠানটির প্রতি।

কিন্তু ২০০৫ সালে এই স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি নগরী থেকে দক্ষিণসুরমার তেতলি ইউনিয়নের অতিরবাড়ি এলাকায় স্থানান্তর করা হলে সেই চিত্র বদলে যেতে শুরু করে। তৎকালীন সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফি আহমদ চৌধুরীর উদ্যোগে সেখানে নতুন ভবন ও আবাসিক কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়। স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে উঠলেও হাসপাতালটি কার্যত একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এতে সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন মা ও শিশুরা।

‘তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে স্থায়ী ভবনে হস্তান্তরের নামে প্রতিষ্ঠানটি শহর থেকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর এ বিষয়ে অসংখ্যবার স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু এটি ফেরাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন নির্দিষ্ট একটি এলাকার মানুষ ছাড়া হাসপাতালটির বিষয়ে কেউ জানেন না’

সিলেট ছাড়াও সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে একটি করে জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। সেগুলোর অবস্থান জেলা শহরেই। কিন্তু সিলেটের জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র একটি উপজেলার গ্রামীণ এলাকায় স্থানান্তর করে নিয়ে যাওয়ার পেছনে কারণ কী, সেই প্রশ্ন খোদ স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের।

তারা বলছেন, মদিনা মার্কেটে থাকা অবস্থায় নগরীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে সহজে রোগীরা আসতে পারতেন। কিন্তু তেতলীতে স্থানান্তরের পর দূরবর্তী উপজেলার রোগীদের জন্য যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে রোগীর চাপও কমে যায়। হাসপাতালটি স্থানান্তরে জনস্বার্থের বিষয়টি কম বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রটি স্থানান্তরে পরিকল্পনার চেয়ে রাজনৈতিক ‘কৃতিত্ব’কে অগ্রাধিকার বেশি দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য তাদের।

এমপির প্রভাবে গ্রামে ‌‘নির্বাসিত’ জেলা স্বাস্থ্যসেবাসিলেট জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র/ছবি-জাগো নিউজ

পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে স্থায়ী ভবনে হস্তান্তরের নামে প্রতিষ্ঠানটি শহর থেকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর এ বিষয়ে অসংখ্যবার স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু এটি ফেরাতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন নির্দিষ্ট একটি এলাকার মানুষ ছাড়া হাসপাতালটির বিষয়ে কেউ জানেন না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৫ সালের ২৫ জুন দক্ষিণ সুরমা উপজেলার তেতলি ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর অতিরবাড়ি এলাকায় প্রায় পাঁচ শতক জমির ওপর জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য শফি আহমদ চৌধুরী। জায়গাটি দান করেন স্থানীয় আটজন ব্যক্তি।

সরজমিন হাসপাতালটি ঘুরে দেখা গেছে, তিনতলা ভবনের প্রতিটি তলা খুবই পরিপাটি। রোগী কম থাকায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা হাসপাতালটিকে নিজের ঘরের মতো সাজিয়ে-গুছিয়ে রেখেছেন। নিচতলায় মেডিকেল অফিসারের কক্ষ। তার পাশেই নার্সের কক্ষ। রয়েছে কিশোর-কিশোরী সেবা কক্ষ, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার, পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকার কক্ষ ও ডিসপেনসারি।

দ্বিতীয় তলায় ২০ শয্যার একটি কক্ষ। রোগী ভর্তি না থাকায় শয্যাগুলো খুবই পরিপাটি করে গোছানো। একই তলায় রয়েছে একটি সাধারণ অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওটি) ও লেবার ওটি। অ্যানেস্থেসিস্ট না থাকায় দীর্ঘদন ধরে বন্ধ ওটি। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দামি দামি যন্ত্রপাতি। তবে পরিবার পরিকল্পনা কর্মী থাকায় স্বাভাবিক প্রসবের জন্য লেবার ওটি ব্যবহার করায় এটি সচল রয়েছে। তৃতীয় তলায় দেখা গেলো আরও কয়েকটি পরিত্যক্ত কক্ষ।

‘জেলা পর্যায়ে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলো সাধারণত শহরের ভেতরে থাকে। তবে সিলেটের ক্ষেত্রে এটি শহর থেকে কিছুটা দূরে। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা অন্যান্য হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে হয়তো এটি করা হতে পারে’ —উপপরিচালক

তিনতলা ভবনের পাশেই রয়েছে চিকিৎসক ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের আবাসন ব্যবস্থা। একটি ভবনে থাকেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির মেডিকেল অফিসার ইশরাত জাহান খান। আরও একটি ভবনে থাকেন দুজন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা।

আরও পড়ুন:
চতুর্মুখী চাপে চিড়েচ্যাপ্টা বোরো চাষি
টিউশনির জমানো টাকায় ফলবাগান, বছরে আয় ৭ লাখ টাকা
টেকনাফের খাল-বিল এখন রোহিঙ্গাদের বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়
চিকিৎসা নিতে এসে খোয়া যাচ্ছে টাকা-স্বর্ণালংকার, উদ্বিগ্ন রোগীরা
অর্ধযুগ আমদানি নেই, বন্ধের পথে রপ্তানিও
হাসপাতালের কোয়ার্টারে মুরগির খামার, দুর্গন্ধে নাকাল রোগী-পথচারী

সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির ঠিক পাশেই তালাবদ্ধ ঘরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে একটি অ্যাম্বুলেন্স। সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনো রোগীর উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে এই অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে জেলা শহরে পাঠানো হতো। কিন্তু ২০১৩ সালের পর থেকে চালক না থাকায় অ্যাম্বুলেন্সটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

এমপির প্রভাবে গ্রামে ‌‘নির্বাসিত’ জেলা স্বাস্থ্যসেবারোগী সংকটে খালি পড়ে আছে শয্যা/ছবি-জাগো নিউজ

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন স্থাপনায় ভবন নির্মাণ হলেও দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রটিতে জনবল ও সরঞ্জাম সংকট রয়েছে। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ওষুধের ঘাটতিও রয়েছে। প্রায় ১০ মাস ধরে নেই ওষুধ।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে দুজন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুমেদিত ১০টি পদ রয়েছে। ১০ পদের বিপরীতে কর্মরত সাতজন। এর বাইরে ডেপুটেশনে (প্রষণে) দুজন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা, একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও একজন আয়া কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে এই জনবল দিয়েই চলছে প্রতিষ্ঠানটির সেবাদান কার্যক্রম।

সিলেট নগরীর জালালাবাদ এলাকার বাসিন্দা জাহানারা বেগম। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘জেলা হাসপাতাল কেন উপজেলার এত ভেতরে থাকবে? শহরে থাকলে মানুষ সহজে চিকিৎসা নিতে পারতো। এখন যাতায়াতের কষ্ট আর খরচের কারণে অনেকেই আসতে চাইবে না।’

তিনি বলেন, ‘শুনেছি এই হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারির জন্য ভালো ছিল। এসময় যদি এরকম বিশ্বস্ত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান শহরে থাকতো, তাহলে অসংখ্য মানুষ উপকৃত হতো।’

দক্ষিণসুরমার লালাবাজার এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘হাসপাতালটি বড় আর সুন্দর হলেও সেবার অনেক অভাব রয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধা নেই। প্রয়োজন হলে আবার শহরে যেতে হয়। গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় তদারকি কম। এজন্য পর্যাপ্ত সেবা পাওয়া যায় না।’

স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির মেডিকেল অফিসার ইশরাত জাহান খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই হাসপাতালে প্রতিদিন ৭০-৮০ রোগী আসেন। বেশিরভাগই পরিবার পরিকল্পনার সেবা নেন। প্রতিমাসে গড়ে ১৫-২০টি নরমাল ডেলিভারি হয়। একসময় এখানে সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করা হতো। এক বছর ধরে মেডিকেল অফিসার (অ্যানেস্থেসিয়া) অনুস্থিত। যে কারণে সিজারিয়ান সেবা বন্ধ রয়েছে।’

সিলেটের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত বলেন, ‘মা ও শিশু কেন্দ্র সব জায়গায় হতে পারে, শুধু শহরাঞ্চলে হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে এটার পাবলিসিটি নিয়ে আমাদের আরও কাজ করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘মা ও শিশু কেন্দ্রগুলো সাধারণত পরিবার পরিকল্পনার অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান। তাদের প্রশাসনিক কোনো কারণে শিফট (স্থানান্তর) হয়েছে কি-না তা তাদের সঙ্গে আলাপ করলে ভালো হবে।’

এ বিষয়ে সিলেট জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মো. নিয়াজুর রহমান বলেন, ‘জেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলো সাধারণত শহরের ভেতরে থাকে। তবে সিলেটের ক্ষেত্রে এটি শহর থেকে কিছুটা দূরে হওয়ার কারণ কী ছিল তা আমার জানা নেই। আমি যোগদানের অনেক বছর আগেই এটি স্থানান্তর করা হয়েছে।’

এমপির প্রভাবে গ্রামে ‌‘নির্বাসিত’ জেলা স্বাস্থ্যসেবারোগী সংকটে খালি পড়ে আছে শয্যা। অস্ত্রোপচার কক্ষটিও বন্ধ/ছবি-জাগো নিউজ

তিনি আরও বলেন, ‘জেলা পর্যায়ে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলো সাধারণত শহরের ভেতরে থাকে। তবে সিলেটের ক্ষেত্রে এটি শহর থেকে কিছুটা দূরে। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা অন্যান্য হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতে হয়তো এটি করা হতে পারে।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিলেট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শফি আহমদ চৌধুরীর ব্যবহৃত মোবাইলফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এসআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।