টেকনাফের খাল-বিল এখন রোহিঙ্গাদের বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়
• পাঁচ ক্যাম্পে ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের বসবাস
• সৃষ্ট বর্জ্যের ৭০ শতাংশই মিশছে খাল-নদীতে
• পাঁচ ক্যাম্পের জন্য শোধনাগার মাত্র একটি
• বিষাক্ত পানির কারণে লবণ-ফসল উৎপাদনে বিপর্যয়
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি টেকনাফের হ্নীলা এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়। পাঁচটি ক্যাম্পের ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের পয়ঃবর্জ্য ও রাসায়নিক মিশে বিষিয়ে উঠেছে এখানকার খাল-বিল। এর প্রভাবে ধস নেমেছে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে। হুমকির মুখে পড়েছে জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য। ফলে জীবন-জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হ্নীলা ইউনিয়নের মাত্র চার বর্গকিলোমিটার এলাকায় পাঁচটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের বসবাস। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় রয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা। সামান্য বৃষ্টি হলেই ক্যাম্পের ভেতরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ পয়োঃবর্জ্য, প্লাস্টিক ও পচা আবর্জনা খাল হয়ে সরাসরি নাফ নদে গিয়ে মিশছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যাম্পের আশপাশে নিচু এলাকায় বসবাসের পরিবেশ চরম অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন স্থানীয়রা। খাল ও নদের পানি দূষিত হয়ে জলজ প্রাণীর বাসস্থান নষ্ট হচ্ছে। মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
তারা জানান, এক সময় এই খালের পানি দিয়েই তারা বছরের বারো মাস কৃষিকাজ করতেন। কিন্তু এখন সেই বিষাক্ত পানি জমিতে দিলে ফসল পুড়ে যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হ্নীলা ইউনিয়নের আলীখালী খাল, মুচনী ছুরি খাল, জাদীমুরা জাদীর খাল ও ওমর খালের পানি ব্যবহারের যোগ্যতা হারিয়েছে বহু আগেই। ক্যাম্পের লিকুইড বর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য মিশে খালের পানির রঙ আলকাতরার মতো কালো হয়ে গেছে। এর উৎকট গন্ধে খালের পাড় দিয়ে হাঁটাচলা করা দায় হয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুন
এক সময়ের আশীর্বাদ কমলা নদী এখন কৃষকের জন্য ‘অভিশাপ’
সাভারের ট্যানারি বর্জ্য কেড়ে নিচ্ছে ধলেশ্বরীর প্রাণ
দখল-দূষণমুক্ত কর্ণফুলী নদীর দাবিতে ‘বিনি সুতার মালা’ কর্মসূচি
লেদা এলাকার কৃষক জুবায়ের আক্ষেপ করে জাগো নিউজকে বলেন, এই পচা পানি এখন লবণ মাঠেও দেওয়া যায় না। বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে লবণ উৎপাদন হচ্ছে না। লোনা পানির বদলে এখন খালে শুধু রোহিঙ্গাদের ময়লা পানি আসে। ফলে লবণ চাষিদের প্রতিবছর ক্ষতির মাশুল গুনতে হচ্ছে।
একই এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে আসা দুর্গন্ধযুক্ত বিষাক্ত পানি এখন খাল-বিল ছাপিয়ে নাফ নদীতে গিয়ে পড়ছে। এই ময়লা পানির কারণে খালের পানি ব্যবহারের যোগ্যতা হারিয়েছে। কৃষকরা তাদের জমিতে সেচ দিতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন। এভাবে দূষণ চলতে থাকলে এই এলাকার খালগুলো চিরতরে মরে যাবে এবং কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে পড়বে।
হ্নীলার জেলে নুরুল আলম বলেন, এক সময় খাল-বিল আর নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন বিষাক্ত পানির কারণে মাছ পাওয়া যায় না। তার ওপর বৃষ্টির সময় এই নোংরা পানি উপচে আমাদের ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়ে।
টেকনাফ লবণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হোসাইন মুহাম্মদ আনিম জানান, আলীখালী, লেদা ও মুচনী এলাকার লবণ চাষিরা এখন নিঃস্ব হওয়ার পথে। বিষাক্ত বর্জ্যের কারণে লবণের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফের এই পাঁচটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাত্র একটি ওয়াটার ট্রিটম্যান্ট প্লান্ট রয়েছে। ২৭ নম্বর ক্যাম্প এলাকা জাদীমুরায় ওই ট্রিটমেন্ট প্লান্টটির অবস্থান। ট্রিটমেন্ট প্লান্টটি ওই ক্যাম্পের জন্যও অপ্রতুল। অথচ বাকি চারটি ক্যাম্পের কোনোটিতেই ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট নেই।
আরও পড়ুন
পয়ঃবর্জ্য নেই, ঝিলের পানি শোধন করেই চলছে দাশেরকান্দি এসটিপি
ঢাকার খালে টয়লেটের লাইন, পাড়ে নাক চেপে বসবাস
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এনজিও কর্মকর্তা জানান, রোহিঙ্গাদের সৃষ্ট গৃহস্থালি বর্জ্যের মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি ৭০ শতাংশ বর্জ্য, বিশেষ করে টয়লেটের লিকুইড বর্জ্য সরাসরি পার্শ্ববর্তী খাল ও নদীতে যাচ্ছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমেও এখানকার খালের পানির রং স্বাভাবিক থাকে না।
টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, খালগুলোর পানির গুণাগুণ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। এই পানি কোনোভাবেই ফসল উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য নয়। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।
টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) খানজাদা শাহরিয়ার বিন মান্নান পরিস্থিতির গুরুত্ব স্বীকার করে বলেন, অল্প জায়গায় বিশাল জনগোষ্ঠীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সত্যিই চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটি ক্যাম্পে আধুনিক ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপন করা না গেলে এই দূষণ রোধ করা সম্ভব নয়। আমরা চেষ্টা করছি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক করতে।
পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, দ্রুত এই বিষাক্ত বর্জ্য নিঃসরণ বন্ধ করা না গেলে নাফ নদীর জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়ার পাশাপাশি টেকনাফের মাটি ও পানি দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
কেএইচকে/এফএ/এমএস