বিএনপির রেষারেষি

৭১ হাজার টাকার মেলার ইজারা ঠেকলো পৌনে ৭ লাখে

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কিশোরগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৫:৩৫ পিএম, ১২ মে ২০২৬
সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটাকে ঘিরে বৈশাখী মেলার ইজারা মূল্য উঠেছে সর্বোচ্চ ছয় লাখ ৮৫ হাজার টাকা

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়ায় সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটাকে ঘিরে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলার ইজারা মূল্য নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির দুই গ্রুপের রেষারেষির জেরে গতবছরের ৭১ হাজার ৭০০ টাকার মেলার ডাক এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৮৫ হাজার টাকায়।

ইজারা মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় খেলনা, ফুচকা, ডালপুরি বিক্রেতারাসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভাড়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, অতিরিক্ত খাজনার চাপ শেষ পর্যন্ত দোকানিদের ঘাড়েই পড়বে। তবে মেলা কমিটির দাবি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই খাজনা নির্ধারণ করা হবে। কাউকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হবে না।

রোববার (১০ মে) বিকেলে উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের হলরুমে উন্মুক্ত নিলামে অংশ নেন সাতজন। এতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন খান দিলীপ খান ও সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান কাঞ্চনের গ্রুপের লোকজনও অংশ নেন। এতেই দুই পক্ষের রেষারেষিতে ৭১ হাজার ৭০০ টাকার ইজারা মূল্য ছয় লাখ ৮৫ হাজার টাকায় ওঠে। নিলামে উপজেলা বিএনপির সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন খান দিলীপ খানের পক্ষের লোক হুমায়ুন মেলার ডাক পান। বিপরীতে সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান কাঞ্চনের লোক সুরুজ মিয়া ছয় লাখ ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত দর তোলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিবছর বৈশাখের শেষ বুধবার থেকে তিন দিনব্যাপী মেলা চলে। বৈশাখী এ মেলার প্রচলন চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ জমিদার হরি কিশোর রায় চৌধুরীর সময়কাল থেকে শুরু হয়। শ্রী শ্রী কাল ভৈরবী পূজা উপলক্ষে তিনি এ মেলার প্রচলন শুরু করেছিলেন। এ বাড়িটি এলাকায় ‌‘রায় বাড়ি’ নামেই পরিচিত। তবে সারাদেশে সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটা নামেই পরিচিত এটি।

৭১ হাজার টাকার মেলার ইজারা ঠেকলো পৌনে ৭ লাখে

নিলামে অংশ নেওয়া বিএনপিকর্মী সুরুজ মিয়া বলেন, ‘একসময় দীর্ঘ ১৫ বছর আমি মেলা পরিচালনা করেছি। এর আগে এত মূল্যে ইজারা কেউ নেয়নি। এবছর ছয় লাখ ৮৫ হাজার টাকায় ডাক পায় আমার বিপক্ষে অংশ নেওয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতির পক্ষের হুমায়ুন। আমিও ছয় লাখ ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত কম্পিটিশন করেছি। আমি যদি ইজারা পেতাম, তাহলে নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে মেলা চালাইতাম। এখন যারা ইজারা পেয়েছেন তারা আসলেই ইজারা মূল্য পরিশোধ করবেন কি-না, সেই প্রশ্ন আলোচনা হচ্ছে।’

পার্শ্ববর্তী উপজেলার চরকনা নতুন বাজার থেকে আসা ব্যবসায়ী আলাল মিয়া জানান, দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে তিনি এই মেলায় ব্যবসা করছেন। এতদিন এক হাজার টাকা খাজনা দিয়ে ব্যবসা করলেও এবার কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দাবি করা হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

আলাল মিয়া বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ৬-৭ দিন বাচ্চাদের খেলনার ছোটখাটো ব্যবসা করি সামান্য লাভের আশায়। এখন যদি ৭-৮ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়, তাহলে সেটা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। কর্তৃপক্ষ যেন বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে।’

ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আশিকুর রহমান আবিদ জানান, প্রতিবছরই তিনি মেলায় ফুচকার দোকান দেন। গতবছর তার দোকানের ভাড়া ছিল চার হাজার টাকা। এবারের ইজারা মূল্য বেশি হওয়ায় ভাড়াও কিছুটা বাড়তে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, ‘বেচাকেনা ভালো হলে সমস্যা নেই। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি বা খারাপ আবহাওয়ার কারণে বিক্রি কম হলে চড়া ভাড়ার কারণে অনেক ব্যবসায়ী লোকসানে পড়বেন। ভাড়া কিছুটা কম থাকলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য টিকে থাকা সহজ হতো।’

৭১ হাজার টাকার মেলার ইজারা ঠেকলো পৌনে ৭ লাখে

এ বিষয়ে মসূয়া ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা নাজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা মূলত মেলার সার্বিক পরিস্থিতি ও আইন-শৃঙ্খলার বিষয়টি দেখভাল করি। যারা ইজারা নিয়েছেন তারাই সব কার্যক্রম পরিচালনা করেন। শুনেছি, প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য রয়েছে এই মেলার। বৈশাখ মাসের শেষ বুধবার থেকে মেলা শুরু হয়। সাধারণত তিন দিন চলে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মেলার ডাক উপজেলা পরিষদের মাধ্যমে হয়। আয়-ব্যয়ের বিষয়ও উপজেলা পরিষদের অধীনে। ইজারা মূল্য বাড়লে তার প্রভাব তো পড়বেই। কারণ যারা ইজারা নিয়েছেন, তারা সেই টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করবেন।’

মেলা কমিটির সদস্য মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, ‘এটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী মেলা। এবারের মেলা ৭-১০ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। আমরা চাই ব্যবসায়ীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবসা করুক।’

তিনি আরও বলেন, গতবছর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করেই খাজনা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এবারও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।

৭১ হাজার টাকার মেলার ইজারা ঠেকলো পৌনে ৭ লাখে

কোনো ব্যবসায়ীর ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হবে না বলেও জানান মোহাম্মদ মোস্তফা। তিনি বলেন, ‘এবার মেলার ইজারা হয়েছে ছয় লাখ ৮৫ হাজার টাকায়। কালেকশন কম হলে বা লোকসান হলেও কমিটি সেই দায় নেবে। কারণ এটি আমাদের এলাকার প্রাণের মেলা ও ঐতিহ্য।’

মেলা কমিটির সভাপতি দাবি করা মসূয়া ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি গোলাপ মিয়া বলেন, তিনি নিজে ইজারা পাননি। তার দাবি, হুমায়ুন নামের একজন ছয় লাখ ৮৫ হাজার টাকায় মেলার ডাক পেয়েছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান কাঞ্চন বলেন, ‘রাগ-আক্রোশ-রেষারেষির জন্য মেলার ডাক এত টাকা হয়েছে। এত টাকা মেলা থেকে তোলা সম্ভব নয়।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, ছয় লাখ ৮৫ হাজার টাকায় একজন মেলাটির ইজারা পেয়েছেন। গতবছর এই ইজারা মূল্য ছিল ৭১ হাজার ৭০০ টাকা।

এসকে রাসেল/এসআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।