হারিয়ে গেছে মহাস্থান জাদুঘরের একটি মূর্তি, জানা গেলো ১৯ বছর পর

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া
প্রকাশিত: ০৭:১৬ পিএম, ১২ মে ২০২৬
বগুড়ার মহাস্থান জাদুঘর/ছবি-জাগো নিউজ

ফ্রান্সে যাওয়ার পথে হারিয়ে যায় একটি মূর্তি
ফেরত আসা ৪৭টি মূর্তি আসল না নকল রহস্য
আসল প্রত্নমূর্তির মূল্য কয়েক কোটি টাকা থেকে শতকোটি টাকা পর্যন্ত
১৯ বছর পর তদন্তে সাত সদস্যের কমিটি

ফ্রান্সগামী পথে হারিয়ে যায় একটি মূর্তি। এরপর থেমে যায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী। দেশে ফিরিয়ে আনা হয় মহাস্থান জাদুঘরের ৪৭টি প্রত্নতাত্ত্বিক মূর্তি। কিন্তু এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৯ বছর। এসময়ের মধ্যে কেউ খতিয়ে দেখেননি ফেরত আসা নিদর্শনগুলো আসল নাকি নকল? কোনো তালিকাও মিলিয়ে দেখা হয়নি। হয়নি কোনো তদন্ত।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্রকাশ্যে বিষয়টি তুলে ধরার পর দেশজুড়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— বাংলাদেশ কি অমূল্য প্রত্নসম্পদ হারিয়েছে? আর যদি হারিয়েই থাকে, তাহলে এত বছর বিষয়টি চাপা ছিল কেন? প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কারা কারা এরসঙ্গে জড়িত ছিল?

সোমবার (১১ মে) বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রতিমন্ত্রী জানান, ২০০৭ সালে ফ্রান্সে প্রদর্শনীর জন্য পাঠানো হয়েছিল বাংলাদেশের তিনটি জাদুঘরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এরমধ্যে মহাস্থানগড় জাদুঘরের ৪৭টি মূর্তিও ছিল। প্রথম চালান চলে যাওয়ার পর দ্বিতীয় চালান পাঠানোর সময় বিমানবন্দর থেকে একটি মূর্তি গায়েব হয়ে যায়। পরে পুরো প্রদর্শনী বাতিল করা হয়।

সভায় সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে প্রতিমন্ত্রীর একটি বক্তব্য। তিনি বলেন, ‌‘ফেরত আসা মূর্তিগুলো আদৌ আসল কি-না, তা কখনো যাচাই করা হয়নি। বর্তমানে মহাস্থান জাদুঘরের কিছু মূর্তি প্রদর্শনীতে থাকলেও সেই সময়কার বাকি মূর্তিগুলো জাদুঘরের পাশের স্টোররুমে রয়েছে, যা কখনো কাউকে দেখতে দেওয়া হয় না।’

প্রত্নতত্ত্ব গবেষক আব্দুল মান্নানের লেখা ‘মহাস্থানের ইতিকথা’ নামক বইয়ের তথ্যমতে, এই স্থানটি শুধু প্রত্নস্থল নয়, এটি বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম প্রধান দলিল। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন যুগের অসংখ্য নিদর্শন এখান থেকে উদ্ধার হয়েছে। এসব মূর্তির অনেকগুলো ছিল বিরল পাথর খোদাই শিল্পকর্ম, যেগুলোর বয়স হাজার বছরেরও বেশি।

হারিয়ে গেছে মহাস্থান জাদুঘরের একটি মূর্তি, জানা গেলো ১৯ বছর পর

মহাস্থানগড়ের নগর কাঠামো ও বৌদ্ধ নিদর্শন নিয়ে কাজ করে ড. সৈয়দ মাহফুজুল হক জানিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক কালোবাজারে দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন মূর্তির চাহিদা অত্যন্ত বেশি। একটি আসল প্রত্নমূর্তির মূল্য কয়েক কোটি টাকা থেকে শতকোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অনেক সময় এসব নিদর্শন ব্যক্তিগত সংগ্রাহক বা বিদেশি জাদুঘরে গোপনে বিক্রি হয়ে যায়।

এ বিষয়ে বগুড়া লেখক চক্রর সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজজাক বকুল বলেন, ‘বিষয়টি শুনে বেশ অবাক হয়েছি। এতগুলো বছর আগে দেশের প্রত্নসম্পদ বিদেশে প্রদর্শিত হয়ে ফিরে এলো, অথচ সেগুলো আসল না নকল সেটা ঠিকমতো যাচাই হলো না, এটা আপত্তিকর ব্যাপার।’

তিনি বলেন, ‘প্রত্নবস্তু সংরক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। তাই এ কাজে অবহেলা বা সময়ক্ষেপণ সন্দেহ জাগাতেই পারে। দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ব্যাপারে আমাদের আরও সতর্ক হতে হবে।’

এদিকে ঘটনার পর প্রায় দুই দশক কেটে গেলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বড় কোনো অনুসন্ধান হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। কেন মূর্তি হারানোর ঘটনায় তৎকালীন কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি, কেন আন্তর্জাতিক তদন্ত হয়নি, কেন তালিকা মিলিয়ে যাচাই করা হয়নি—এসব প্রশ্ন এখন সামনে চলে আসছে।

মহাস্থানের বাসিন্দা প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বিষয়টি শুরু থেকেই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত হলে এতদিনে সত্য বেরিয়ে আসতে পারত। কিন্তু রহস্যজনকভাবে পুরো বিষয়টি নীরবে চাপা পড়ে যায়। এটি দেশের প্রত্নসম্পদ রক্ষায় ভয়াবহ অবহেলা বললেও ভুল হবে না।’

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, এ ঘটনায় শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে ৯ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে প্রশাসন, র‌্যাব, পুলিশ, জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ও প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা রয়েছেন। এই কমিটি সরেজমিন তদন্ত করে দেখবে বাইরে পাঠানো ৪৭টি মূর্তি সম্পূর্ণ ফেরত এসেছে কি-না, ফেরত আসা নিদর্শনগুলো আসল নাকি রেপ্লিকা, বিমানবন্দর থেকে হারানো মূর্তিটি মহাস্থানের ছিল কি-না, তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোনো গাফিলতি ছিল কি-না ইত্যাদি।

হারিয়ে গেছে মহাস্থান জাদুঘরের একটি মূর্তি, জানা গেলো ১৯ বছর পর

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এটি হাজার কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও উপস্থাপন করা হবে।’

কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্বে থাকা মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টডিয়ান রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটির কেউ এখন প্রর্যন্ত আমার কাছে আসেনি। শুধু কমিটি গঠনের চিঠি এসেছে।’

তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি অনেক আগের। তখন যে কাস্টডিয়ান দায়িত্বে ছিলেন তিনি মারা গেছেন। প্রধান পরিচালক, আঞ্চলিক ও মাঠ কমকর্তারা অবসরে যাওয়ার কারণে ফাইলগুলো দেখতে সময় লাগছে। তদন্ত প্রতিবেদন সামনে এলেই মূর্তিগুলো আসল নাকি নকল— এসব বিষয় নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

এ বিষয়ে জানতে রাজশাহী বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক এ কে এম সাইফুর রহমানের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

তদন্ত প্রতিবেদনের অগ্রগতির বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিয়াউল ইসলাম বলেন, কার্যক্রমে এখনো শুরু হয়নি। শিগগির তদন্তের কাজ শুধু করা হবে।

এসআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।