সংরক্ষিত বন থেকে উজাড় হচ্ছে গাছ-বাঁশ

মাহিদুল ইসলাম মাহিদুল ইসলাম , জেলা প্রতিনিধি মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৩:০৯ পিএম, ১৩ মে ২০২৬
মৌলভীবাজারের রাজকান্দি রেঞ্জের আদমপুর বিট এলাকা থেকে বাঁশ কেটে বিক্রির জন্য ছড়া থেকে উপরে তুলা হচ্ছে/ছবি: জাগো নিউজ

সংরক্ষিত বনাঞ্চালের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা লাউয়াছড়া নামে একটি ছড়া রয়েছে। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ছড়াটিতে এখন পানির তীব্র স্রোত। আর এই স্রোতের ওপর দিয়ে অনবরত ভাসিয়ে আনা হচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে বাঁশ। ছড়ার ওপর পাকা সড়কের একটি ছোট ব্রিজ রয়েছে, সেই ব্রিজের নিচ থেকে ভাসিয়ে আনা বাঁশ ওপরে তুলছেন কয়েকজন শ্রমিক। এরপর সেগুলো সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে ট্রাক বা পিকআপে বিক্রির উদ্দেশ্যে।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে রাজকান্দি রেঞ্জের আওতাধীন আদমপুর বা কাউয়ারগলা বিট সংলগ্ন কোনাগাঁও এলাকায় সম্প্রতি সরেজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে।

ওই এলাকায় ছড়া থেকে বাঁশ তোলার কাজ করছিলেন আহাদ মিয়া নামের এক ব্যক্তি। তার সঙ্গে কথা হলে তিনি দাবি করেন, এই বাঁশগুলো কোনো সংরক্ষিত বন থেকে আনা হয়নি। বিভিন্ন বাড়ি থেকে বাঁশ কিনে তারা ছড়ায় ভাসিয়ে দিয়েছেন ও এখন বিক্রির জন্য ওপরে তুলছেন।

তবে স্থানীয় এলাকাবাসী আহাদ মিয়ার এই বক্তব্য অস্বীকার করে বলছেন, বাঁশগুলো সংরক্ষিত বনের ভেতর থেকেই কেটে আনা হয়েছে। কারণ এই ছড়াটি সরাসরি বনের ভেতর দিয়ে বয়ে এসেছে। শুধু বৃষ্টি বা ছড়ায় স্রোত থাকলে এভাবে বাঁশ ভেসে আসে। বছরের অন্য সময় এমন চিত্র দেখা যায় না।

সংরক্ষিত বন থেকে উজাড় হচ্ছে গাছ-বাঁশ

বন উজাড়ের এই চিত্র শুধু রাজকান্দি রেঞ্জের নয়, জেলার জুড়ী, বড়লেখা, কুলাউড়া রেঞ্জসহ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর থেকেও নিয়মিত বাঁশ ও গাছ উজাড় করা হচ্ছে। সম্প্রতি লাউয়াছড়া বনের ভেতর চুরি হওয়া অর্ধশতাধিক গাছের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। অবাধে গাছ, বাঁশ ও বেত উজাড় হলেও বন বিভাগের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

জেলার পরিবেশকর্মীরা বলছেন, মৌলভীবাজার দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জেলা। এখানে পাহাড় ও সমতলে বহু ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে বসবাস করে আসছে। এ জেলায় প্রচুর সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকলেও তা এখন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। বনের ভেতরে এখন আর আগের মতো বড় বড় গাছ দেখা যায় না। একসময় বনের বাঁশ মহাল ইজারা দেওয়া হতো, এখন আর তার প্রয়োজন হয় না। কারণ যে যার মতো করে লুটপাট করতে পারছে।

আরও পড়ুন:
খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরু
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধস
বুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেলায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ চারটি রেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে আয়তনে সবচেয়ে বড় রাজকান্দি রেঞ্জ। এই রেঞ্জের লাউয়াছড়া, চম্পারায়, বাঘাছড়া, ডালুয়াছড়া, কুরমাছড়া, সোনারাইছড়া ও সুনছড়া এলাকা থেকে নিয়মিত বনজ সম্পদ পাচার হচ্ছে। এ ছাড়া জুড়ী রেঞ্জের সুরমাছড়া, রাগনাছড়া, পুটিছড়া, ধলাইছড়া, বড়লেখা রেঞ্জের লাটুছড়া, হাতমাছড়া ও মাধবছড়া এবং কুলাউড়া রেঞ্জের পশ্চিম গোগালী ও লবণছড়াসহ বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে গাছ ও বাঁশ উজাড় করা হচ্ছে। এলাকাগুলো দুর্গম হওয়ায় বন বিভাগের নজরদারি এড়িয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় বছরের পর বছর এই লুটপাট চলছে।

সংরক্ষিত বন থেকে উজাড় হচ্ছে গাছ-বাঁশ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশেই বন থেকে গাছ ও বাঁশ পাচার হয়। বিশেষ করে বৃষ্টির পর ছড়ায় পানির স্রোত বাড়লে নৌপথে সহজেই বাঁশ পাচার করা যায়। আর বছরের অন্য সময় রাতের আঁধারে চলে গাছ কাটা। এমনকি জনবহুল সড়কের পাশ থেকেও গাছ চুরি হলেও বন বিভাগ নীরব ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদের কার্যনির্বাহী সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল বলেন, ‘যারা বনের গাছ ও বাঁশ পাচার করছে, তারা শুধু পরিবেশ ও প্রতিবেশের নয়, বরং বন্যপ্রাণীরও চরম ক্ষতি করছে। তারা বিনা পুঁজিতে ব্যবসা করে লাভবান হচ্ছে। এদের শক্ত হাতে প্রতিহত করা বন বিভাগের দায়িত্ব। বন বিভাগ যদি বন রক্ষা করতে না পারে, তবে এমন বিপর্যয় হওয়াটাই স্বাভাবিক।’

এ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, ‘আমাদের তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। কিছু অসাধু চক্র সবসময়ই বনজ সম্পদ চুরির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। তবে আমাদের পক্ষ থেকে গাছ ও বাঁশ পাচার রোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।’

এমএন/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।