নওগাঁয় প্যাশন ফল চাষে অপার সম্ভাবনা


প্রকাশিত: ০৩:০১ এএম, ০৭ অক্টোবর ২০১৬

নওগাঁর পত্নীতলা উপজেলায় ‘প্যাশন’ ফল চাষে অপার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। এই ফল থেকে ট্যাংয়ের মতো শরবত তৈরি হয় বলে দেশে এটি ট্যাং ফল নামেও পরিচিতি।

উপজেলার দিবর ইউনিয়নের রূপগ্রাম এগ্রো ফার্মের পরিচালক সোহেল রানা চাষ করছেন সুস্বাদু এই বিদেশি ফল ‘প্যাশন’। ইত্যেমধ্যে একটি গাছে ১৮/২০টি ফল ধরেছে। এছাড়া আরো প্রায় এক/দেড়শ ফুল আছে। জেলায় এই ফল আরো বেশি করে চাষের আগ্রহ দেখা দিয়েছে। তাই এ ফল চাষে প্রশিক্ষণ এবং সার্বক্ষণিক কৃষি পরামর্শ চেয়েছেন স্থানীয়রা।

ফার্মের পরিচালক সোহেল রানা জানান, ২০১৫ সালে ঢাকা জাতীয় বৃক্ষ মেলা থেকে প্যাশন ফলের একটি কাটিং চারা এনে খামারে রোপন করেন। লতানো এই গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু হলে একটি মাচা করে দেন। এক বছর পর গত জুলাই মাস থেকে গাছে ফুল ফোটা শুরু করে। প্রথম দিকে গাছে অনেক ফুল ফুটলেও এর কোনোটিই ফলে পরিণত না হয়ে ঝরে যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্যাশন বা ট্যাং ফল তুলনামূলকভাবে দেশে কম প্রচলিত। বিভিন্ন নার্সারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে সীমিত আকারে চাষ হচ্ছে। এই ফলের শরবত অত্যন্ত সুস্বাদু ও পুষ্টিকর। প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন সি এতই বেশি যে ফলের এক-চতুর্থাংশ একজন মানুষের নিত্যদিনের ভিটামিন সির চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

এই গাছ লতানো, পাতা সবুজ ও কিনারা গভীরভাবে খাঁজকাটা। ফল সুগোল, বড় সফেদা আকারের ও খোসা শক্ত। পাকা-ফলের রং হলদেটে। ফলটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘প্যাসিফ্লোরা ইডিউলাস’। মিষ্টি স্বাদ ও উপকারিতার কারণে অনেক দেশেই ফলটি বেশ জনপ্রিয়।

নওগাঁ জেলায় অল্প কয়েকটি প্যাশন ফলের গাছ আছে। এর মধ্যে দুই একটি গাছে ফুল এলেও অধিকাংশ গাছে এখন পর্যন্ত কোনো ফল ধরেনি। তবে গাছের বয়স বাড়লে ফল হতে পারে। প্যাশন গাছে বছরে দুবার ফল ধরে। প্রথমবার মার্চ-এপ্রিল মাসে ফুল আসে এবং জুন-আগস্ট মাসে ফল পাওয়া যায়। দ্বিতীয়বার জুলাই-আগস্ট মাসে ফুল আসে এবং ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে ফল পাওয়া যায়।

Pashion

গাছ লাগানোর ১২ থেকে ২০ মাসের মধ্যেই সধারণত ফুল ও ফল পাওয়া যায়। ১৮ থেকে ২০ মাস বয়সের একটি গাছে ১০০ থেকে ২০০টি ফল পাওয়া যায়। গাছপ্রতি ফলন ৫ থেকে ১০ কেজি হয়। পূর্ণাঙ্গ ফল গোলাকার বা ডিম্বাকার। কাঁচা অবস্থায় এটি সবুজ হয়। তবে পরিণত অবস্থায় হলুদ রং ধারণ করে। ফলটি অত্যন্ত পুষ্টিগুণ সম্পন্ন।  

সোহেল রানা বলেন, প্যাশন গাছের ফুল একটি প্যারাগুয়ের জাতীয় ফুল। প্যাশন ফল চাষ সম্পর্কে জানার জন্য ইন্টারনেটে খোঁজাখুঁজি করে অনেক তথ্য সংগ্রহ করি। প্যাশন ফুলে কৃত্রিম উপায়ে পারাগায়ণ করলে দ্রুত এবং অনেক বেশি ফল পাওয়া যায়।

এছাড়া ইউটিউবে বেশ কিছু ভিডিও দেখে পরাগায়নের কলাকৌশল শিখে গাছে প্রয়োগ করি। কিছুদিনের মধ্যে গাছে ফুল আসা শুরু করে। আর আত্মবিশ্বাস ছিল ফুল যেহেতু হচ্ছে ফল হবেই। এজন্য ইন্টারনেটে পড়াশুনা করে পশ্চিমা এই ফল চাষের যাবতীয় কৌশলগুলো রপ্ত করতে থাকি।

এখন প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন খামারে আসছেন প্যাশন ফল দেখতে। এখন গাছ থেকে চারা তৈরি করছি। আগ্রহী অনেকেই চারা সংগ্রহ করেন।

সোহেল রানা আরো বলেন, প্যাশন চাষে কোনো সার, সেচ, কীটনাশক এমনকি বিশেষ কোনো পরিচর্যারও প্রয়োজন হয় না। প্যাশন ফলের বীজকে আবৃত করে থাকা হলুদ সুগন্ধিযুক্ত পাল্পকে পানিতে দ্রবীভূত করে খুবই উপাদেয় শরবত প্রস্তুত করা যায়। এটিকে অন্যান্য জুসের সঙ্গেও মিশিয়ে খাওয়া যায়।

বাজারে প্রচলিত কেমিক্যাল মিশ্রিত শরবতের চেয়ে প্যাশন বা ট্যাং ফল দিয়ে তৈরি শরবত অনেক বেশি সুস্বাদুু ও প্রাকৃতিক গুণ সম্পন্ন।

আগামী বছর এক বিঘা জমিতে এই ফলের চাষ করবেন বলে ভাবছেন সোহেল রানা। তার খামারের ১৫ বিঘা নিজস্ব জমিতে ড্রাগন ফল, বারি মাল্টা-১, আম, লিচু, থাই পেয়ারাসহ ৫০ প্রজাতির ফলের গাছ রয়েছে।
 
জেলার সাপাহার উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বাবুল আকতার জানান, সোহেল রানাকে বিভিন্ন সময় এই ফল চাষে সহযোগিতা করা হচ্ছে। এই ফল চাষে সফলতা পাওয়া গেছে। এটি একটি অত্যন্ত লাভজনক ফসল হিসেবে সমাদৃত হতে পারে। এই ঠাঁ-ঠাঁ বরেন্দ্র এলাকার হাজার হাজার পতিত জমিতে এই ফল চাষ করা সম্ভব হবে বলেও তিনি মনে করেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক সত্যব্রত সাহা জানান, জেলায় ‘প্যাশন’ ফলের বেশ কয়েকটি গাছ থাকলেও একটিতে সাফল্য পাওয়া গেছে। এই সাফল্য অন্যান্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে দিয়ে বরেন্দ্র ভূমির পতিত এলাকা পোরশা, সাপাহার ও পত্নীতলা উপজেলাসহ জেলায় আরো ব্যাপকভাবে চাষে উদ্বুদ্ধ করা হবে।
 
এফএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।