কুড়িগ্রামের সফল কৃষক দম্পতি ধীরেন-দীপ্তি


প্রকাশিত: ০৩:৩২ এএম, ১৬ অক্টোবর ২০১৬

একটা সময় সংসারের উপর দিয়ে বয়ে গেছে ঝড়। তারপর কঠোর পরিশ্রম আর রবি শস্য চাষ করে চিত্রটা যেন পাল্টে গেল। ধীরে ধীরে স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করলাম। কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রামের সফল কৃষক দম্পতি ধীরেন ও দীপ্তি।

সরেজমিনে ধীরেন্দ্রনাথ দাসের (৩৮) বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সবুজ ফসলের ক্ষেতে বেগুন তুলছেন তিনি। পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী দীপ্তি রানী। চোখে মুখে হাসির ছটা। বেগুনের নাকি গুণ নেই। এক সময় পাতে তোলা হতো না এই সবজিটি। কিন্তু এখন সময় পাল্টে গেছে।

বাজারে এখন অগ্নিমূল্যে কিনতে হয় এই সবজি। রোজার মাস হলে তো কথাই নেই। এই বেগুন, পটল, করলা, লাউ, লালশাক, মূলা, ধনেপাতা, কাঁচা মরিচ চাষ করে পাল্টে গেছে এই চাষী দম্পত্তির জীবন। স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে তারা।
    
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকা কুরুষাফেরুষা গ্রামের চওড়াবাড়ী কালিরপাটে বাড়ি ধীরেনের। বাড়ি থেকে তিনশ গজ পূবে ভারতীয় কাটাতারের বেড়া। মাঝখানে ক্ষীণকায় নদী নীলকোমল বয়ে চলেছে অবিরাম। এই কাটাতারের এপার-ওপারে রয়েছে গ্রামের রক্তের সম্পর্কের লোকজন।

ধীরেন বলেন, ছোট থাকতেই বাবা মারা যায়। বড় বোনকে বিয়ে দেয়া হয় কাটাতারের ওপারে ভারতীয় বশকোটাল গ্রামে। বাংলাদেশের বাড়ি থেকে বোনের বাড়ির দূরত্ব প্রায় সোয়া কিলোমিটার। যা ভারতীয় কুচবিহার জেলার দীনহাটা থানায় পড়েছে।

পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ১৯৯০ সালে বড় বোন তাকে বশকোটালে নিয়ে গিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দেয়। বোন বাসন্তি আর বোনজামাই মন্টু মন্ডলের সঙ্গে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ছিল। সেখানে এসএসসি পর্যন্ত পড়াশুনা করার পর ইন্টারমেডিয়েটে ফেল করে বাংলাদেশের বাড়িতে ফিরে আসে।

এরপর বাংলাদেশি সার্টিফিকেট না থাকায় সরকারি চাকরির সুযোগ হারায় সে। ধ্যান দেয় বাপের রেখে যাওয়া জমি-জিরাতের কাজে। ধীরে ধীরে গায়ে মাটির গন্ধ মেখে নিরবে চাষের খেলায় মেতে ওঠে। এর মধ্যেই বিয়ে হয় ধীপ্তি রানীর সঙ্গে। সেও কৃষকের সন্তান।

দু’জনে মিলে নতুন উদ্যোমে নেমে পড়ে রবি ফসলের আবাদে। বিয়ের পর ৫ বিঘা জমিসহ আলাদা বাড়ি করে ধীরেন। এরপর কিছু জমি বর্গা নিয়ে বিভিন্ন সবজি চাষ করে। বেশ ভাল দাম পাওয়ায় সবজির উপর ঝোঁক বেড়ে যায়। চাষ করতে থাকে নানান ফসল।

দীপ্তি রানী জানায়, এবারে এক বিঘা জমিতে বেগুন চাষ করা হয়েছে। আবহাওয়া ভাল থাকায় বেগুনের বাম্পার ফলন  হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে ৫ থেকে ৬ মণ বেগুন বিক্রি হচ্ছে। প্রতি বিঘা বেগুন চাষে খরচ হয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

প্রতি মণ বিক্রি হয় ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা। খচর বাদ দিলে বিঘায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা লাভ হয়। এতেই দুজনের স্বাচ্ছন্দে চলে যায়। নিজেরা লেখাপড়া না করায় দু’সন্তানকে তারা শিক্ষিত করার প্রত্যয় নিয়েছে। ছেলে ৯ম শ্রেণিতে এবং মেয়ে ৩য় শ্রেণিতে পড়ে।

Kurigram

ধীরেন অভিযোগ করে বলেন, আমরা প্রকৃত চাষী। চাষবাষ করেই আমাদের জীবনটা কেটে যাচ্ছে। অথচ সরকারের কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না। কৃষি লোনের ব্যাপারে দেন-দরবার করেও কোনো লাভ হয়নি। এ ব্যাপারে উপ-সহকারী কৃষি অফিসাররাও সহযোগিতা করতে পারছে না।

তালিকা চূড়ান্ত করার সময় চেয়ারম্যান-মেম্বাররা তাদের পরিচিতদের নাম রাখতে গিয়ে সীমান্তবর্তী এ এলাকার কৃষকরা বাদ পড়ে যাচ্ছে। একই কথা জানালেন ওই গ্রামের কৃষক সিদ্দিক মিয়া (৪৯)। পনের বছর ধরে সবজি চাষ করছেন তিনি। শুধু কৃষি বিভাগ থেকে সামান্য প্রশিক্ষণ ছাড়া আর কিছু কপালে জোটেনি।

তাই বলে থেমে নেই এখানকার কৃষক। বিশেষ করে কুরুষাফেরুষা ছাড়াও গোরকমন্ডল, চরগোড়কমন্ডল, বালাটারী গ্রাম এখন সবুজের সমারোহ। সারা মাঠ জুড়ে চাষীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। কেউ ফসল তুলছে, কেউবা পরিচর্যায় ব্যস্ত।

এই ফসল চাষ করেই কৃষক হাশেম আলী তার দু’মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলে রংপুর প্যারা মেডিকেলে পড়ছে। পুরো গ্রামের স্বপ্নজুড়ে রয়েছে এখানকার রবি শস্য। বর্তমানে মাঠজুড়ে রয়েছে লাউ, বেগুন, আলু, লালশাক, মূলা, ধনেপাতা,পটল, কাঁচা মরিচসহ নানা ধরনের সবজি।
    
কথা হলো এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুসাব্বের আলী মুসার সঙ্গে। তিনি জানান, আমাদের ইউনিয়নটি হলো সবজি উৎপাদনের ভাণ্ডার। এখানে অনেক কৃষক বিভিন্ন প্রকার সবজি চাষ করে নিজেদের ভাগ্যকে পরিবর্তন করছে। অপ্রতুল সেবায় কৃষকের সংখ্যা বেশি হওয়ায় সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না।
    
ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুবুর রশিদ জানান, এ বছর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৫০ হেক্টর জমিতে চলমান রবি শস্যের চাষাবাদ আছে। সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করতে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা থাকায় যথেষ্ট সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

এসএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।