পাহাড়ের কলা যাচ্ছে সারাদেশে
পাহাড়ে উৎপাদিত কলা বাজারজাত হয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায়। সাপ্তাহিক হাটের দিন বেচাকেনা হয় লাখ লাখ টাকার পাহাড়ি কলা। সরেজমিন ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে রাঙামাটি জেলা সদরের কুতুকছড়ি বাজারে।
প্রতি রোববার সাপ্তাহিক হাটে সেখানে কলার হাট বসে। বাজারটি গড়ে উঠেছে রাঙামাটি-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি সড়কের পাশে পাহাড়ের কোলে। জেলা সদর থেকে এটির দূরত্ব প্রায় ৩০-৩২ কিলোমিটার। আশেপাশের পাহাড়ি গ্রামসহ কয়েকটি উপজেলার গ্রামাঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ কলা কুতুবছড়ি বাজারে আনা হয় বিক্রির জন্য। অন্যদিকে সেখানে কলা কিনতে যান রাঙামাটি শহর ও চট্টগ্রামসহ বাইরের পাইকাররা। বছরজুড়ে সাপ্তাহিক হাটে জমজমাট হয় কলা বেচাকেনা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে বসবাসরত অনেক কৃষিজীবীই নির্ভরশীল এই কলা চাষের ওপর। বলা যায় একেবারে আদিকাল থেকেই বেশিরভাগ পাহাড়ি লোকজনের জীবিকার মূল উৎস কলা চাষ।
স্থানীয়রা জানান, কুতুবছড়ি বাজারে প্রতি হাটবার বিক্রির জন্য কলা নিয়ে যান রাঙামাটি সদরের কুতুবছড়ি, বন্দুকভাঙ্গা, বালুখালী, সাপছড়ি, কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া, নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট, ঘিলাছড়ি, নানিয়ারচর, সাবেক্ষ্যং এবং খাগড়াছড়ি মহালছড়ি উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বহু কলা চাষি।
এসব পাহাড়ি কলা জীপ, ট্রাক, পিকআপে বোঝাই করে রাঙামাটি শহর ও চট্টগ্রামসহ বাইরে নিয়ে যান পাইকারি ব্যবসায়ীরা। কুতুবছড়ি বাজার ছাড়াও জেলার বিভিন্ন বাজারে সাপ্তাহিক হাটের দিন বেচাকেনা হয় এসব কলা। স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে এসব কলা বাজারজাত হয়ে যাচ্ছে বাইরের জেলাতেও।
জানা যায়, পাহাড়ি এলাকায় কলার চাষাবাদ হয় বছরজুড়ে। জুমচাষের পাশাপাশি কলার চাষও পাহাড়িদের আদিম পেশা। কলাচাষে ফলন পাওয়া যায় বছরজুড়ে সব মৌসুমে। বর্তমানে স্থানীয়দের কলাচাষে সহায়তা দিচ্ছে সরকারের কৃষি বিভাগ। ফলে কলার ফলন বেড়েছে আগের চেয়ে অধিক হারে। তবে দুর্গম এলাকায় বাজারজাতে পর্যাপ্ত সুবিধা গড়ে না উঠায় অনেক সময় উৎপাদিত কলার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা।
রাঙামাটি সদরের বন্দুকভাঙ্গা এলাকার কলাচাষী সাধন মণি চাকমা বলেন, বর্তমানে তাদের জীবিকার মূল উৎস কলাচাষ। বছরজুড়ে করেন কলার চাষাবাদ। বাজারে নিয়ে কলা বিক্রি করতে পারেন প্রতি সপ্তাহে। কিন্তু দুর্গম পাহাড়ে চাষাবাদের কারণে উৎপাদিত কলা বাজারে নিয়ে বিক্রি করা খুব কষ্টের। অনেক দূর পাহাড় বেয়ে কলা বহন করে আবার নৌকায় বোঝাই করে নিয়ে বিক্রি করতে হয় বাজারে।
চাষিরা জানান, পাহাড়ে সবচেয়ে অধিক চাষ হয় দেশি প্রজাতির বাংলা কলার। পাশাপাশি চাষ হয় চাঁপা, সবরি, সাগর, আনাচিসহ বিভিন্ন জাতের কলা। পাহাড়ি এলাকায় দেশি প্রজাতি কলার ফলন সবচেয়ে বেশি। কলাচাষ করে এখন সাবলম্বী অনেকে।
স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, রাঙামাটি জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ তিনটি পার্বত্য জেলায় কলার ব্যাপক ফলন হয়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোকজন আর্থিকভাবে লাভবান কলা চাষ করে। রাঙামাটি জেলার স্থানীয় বাজারে প্রতি সপ্তাহের হাটের দিন ছাড়াও প্রতিদিন ট্রাক ভর্তি দেশি জাতের কলা বাজারজাত হয় ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। আবাহাওয়া ও মাটির উর্বরতার ফলে দেশীয় কলাচাষের উপযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে।
পার্বত্যাঞ্চলে পাহাড়িরা দেশীয় কলার চাষ এখনও আদি পদ্ধতিতেই চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে অনেকে পর্যাপ্ত ফসল উৎপাদনে ব্যর্থ হন। আবার দুর্গমতার কারণে সঠিক সময়ে বাজারজাতকরণের অভাবে উপযুক্ত দাম মেলে না। পরিবহন সুবিধার জন্য রাস্তা-ঘাটের উন্নয়ন হলে কলা বাজারজাত আরও সহজতর হয়ে উঠত বলে মনে করেন চাষিরা।
এফএ/এমএস