কুমিল্লার ঐতিহাসিক বেতিয়ারা শহীদ দিবস আজ


প্রকাশিত: ০৩:০৯ এএম, ১১ নভেম্বর ২০১৬

আজ ১১ নভেম্বর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ঐতিহাসিক বেতিয়ারা শহীদ দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথ দীঘি ইউনিয়নের বেতিয়ারা নামক স্থানে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর নয় বীর যোদ্ধা পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের এই ইতিহাসকে সমুজ্জ্বল রাখতে প্রতি বছর ১১ নভেম্বর পালিত হয় বেতিয়ারা শহীদ দিবস।

জানা যায়, বেতিয়ারায় পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে নিজাম উদ্দিন আজাদ (ছাত্র নেতা), সিরাজুম মনির, জহিরুল হক দুদু, মোহাম্মদ সফি উল্যাহ, আওলাদ হেসেন, আবদুল কাইয়ুম, বশিরুল ইসলাম মাস্টার, মো. শহীদ উল্যাহ সাউদ ও আবদুল কাদের শহীদ হন।

বেতিয়ারা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি রক্ষা কমিটির সভাপতি জিয়াউল হক জিবু ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ জামাল উদ্দিনসহ স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে প্রিয় মাতৃভূমিকে শক্রমুক্ত করার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খানসহ যৌথ গেরিলা বাহিনীর ৭৮ জন সদস্য ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে যুদ্ধে অংশ নেয়ার উদ্দেশ্যে এ গেরিলা যোদ্ধারা ভারতের বাইকোয়া বেইজ ক্যাম্প থেকে ৭১ সালের ১০ নভেম্বর রাত ৮টায় চৌদ্দগ্রাম সীমান্তবর্তী ভৈরব নগর সাব ক্যাম্পে (চৌত্তাখোলা ক্যাম্পের শাখা) পৌঁছেন।

এ বাহিনীর পরিকল্পনা ছিল দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক, শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন কায়সারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নোয়াখালীর সেনবাগ ও কাজীর হাট এলাকা নিয়ে একটি মুক্তাঞ্চল গড়ে তোলা। ভৈরব নগর সাব ক্যাম্পের দুই মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের বিএসসি ও সামসুল আলম ১১ নভেম্বর রাতেই গেরিলা বাহিনীর ওই দলটির বাংলাদেশে প্রবেশের নকশা প্রণয়ন করেন।

প্রণীত নকশা অনুযায়ী সাব ক্যাম্পের ৩৮ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে বেতিয়ারা চৌধুরী বাড়ির দু’পাশে অ্যাম্বুশ পাতা হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক শক্রমুক্ত কিনা পরীক্ষা করার জন্য স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আবদুল কাদের ও আবদুল মন্নানকে ওই সড়কে পাঠানো হয়। সিগনালের দায়িত্বে থাকা কাদের ও মন্নান মহাসড়ক শক্রমুক্ত বলে রাত ১২টায় মূল বাহিনীকে জানায়। তাদের তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ গেরিলা বাহিনীর ৩৮ জনের এ দলটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অতিক্রমের জন্য এগিয়ে আসে।

এ সময় সড়কের অপর (পশ্চিম) পাশে গাছের আড়ালে অ্যাম্বুশ পেতে লুকিয়ে থাকা হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অতর্কিতে ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। এতে ৯ গেরিলা যোদ্ধা ঘটনাস্থলেই শহীদ হন এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। এক সপ্তাহ পর স্থানীয় লোকজন ধানক্ষেত থেকে শহীদদের গলিত মরদেহগুলো উদ্ধার করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পার্শ্বে একটি গর্ত খুঁড়ে মাটি চাপা দেয়।

পরে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রাণপণ লড়াইয়ে ২৮ নভেম্বর চৌদ্দগ্রামের এ জগন্নাথ দীঘি অঞ্চল শক্রমুক্ত হয়। পরদিন ২৯ নভেম্বর স্থানীয় নেতারা এবং মুক্তিযোদ্ধারা গর্ত থেকে মরদেহগুলো উত্তোলন করে ইসলামি শরিয়ামোতাবেক মাওলানা আব্দুল আলীর (মরহুম) মাধ্যমে নামাজে জানাজা দিয়ে মহাসড়কের পশ্চিম পাশে দ্বিতীয়বার দাফন করেন এবং শহীদদের গণকবরের ওপর স্বাধীন বাংলার লাল সবুজের পতাকা উত্তোলন করে পাশেই নির্মাণ করেন স্মৃতিস্তম্ভ।

মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সভাপতি জিয়াউল হক জিবু জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হলে ৯ শহীদের গণকবর ও স্মৃতিস্তম্ভ মহাসড়কের মধ্যে পড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় লোকজনের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ফোরলেন প্রকল্পের সংশ্লিষ্টরা ২০১৪ সালের জুন মাসে গণকবরটি মহাসড়কের পূর্ব পাশে সড়ক ও জনপথের ৪০ শতক জায়গায় স্থানান্তর করে আবার সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ফোরলেন সম্প্রসারিত করে আট লেনে রূপান্তরিত করা হলে আবারো হুমকির মুখে পড়তে পারে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি।

কামাল উদ্দিন/এফএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।