৪৬ বছরেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি মেলেনি সফিয়ারের
স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার হলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পাননি কুড়িগ্রামের সফিয়ার রহমান (৬৬)। বিগত ২০১১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা করা হলেও তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে মরার আগে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চান এই যোদ্ধা।
জানা যায়, স্বাধীনতাযুদ্ধের আগে কুড়িগ্রামের যাত্রাপুরে এসেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য হাত মেলান সফিয়ার রহমান। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে তার অন্ধভক্ত হয়ে যান তিনি।
এরপর ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে জাতির পিতার দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে এক মুহূর্তও দেরি না করে ঘর ছাড়েন সফিয়ার। বাবা-মা সবার কথা ফেলে চলে যান মুক্তিযুদ্ধে। নিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ শেষে দেশ স্বাধীন হলেও আজো মেলেনি তার স্বীকৃতি।
কুড়িগ্রাম জেলা সদরের ঘোগাদহ ইউনিয়নের মরাটারী গ্রামের মৃত সফর উদ্দিন সরকারের ছেলে মো. সফিয়ার রহমান। যুদ্ধ শেষে হলেও শেষ হয়নি জীবনযুদ্ধ। জীবন-জীবিকার যুদ্ধ আজো চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের দুর্গম ঝুনকান চরে ছিল পৈতৃক ভিটেমাটি। চরাঞ্চলে বাড়ি হওয়ায় আর খোঁজ রাখেনি কেউ। ফলে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার পরও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম উঠেনি তার। জীবনের শেষ বেলায় এসে তার শেষ চাওয়া সুযোগ-সুবিধা নয় ‘মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি’।
সফিয়ার রহমান অভিযোগ করে বলেন, দেশ স্বাধীনের ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলে আজো স্বীকৃতি পাইনি। এখনো তালিকাভুক্ত করা হয়নি আমাকে। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে (জামুকা) দীর্ঘদিন ঘোরাঘুরি করে ফিরতে হয়ছে খালি হাতে। ঘোগাদহ ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. আব্দুল কাদের ও কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কমান্ডার মো. বাতেনের তদন্ত করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সুপারিশ করেছেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।
তিনি আরো বলেন, সেদিন ভারতের আসাম রাজ্যের আলিপুরদুয়ার থানার আওতায় ঝাউকুঠি ক্যাম্পের অধীনে ‘বাংলাদেশ ইয়ূথ রিসিপশন ক্যাম্পে’ প্রাইমারি ট্রেনিং গ্রহণ করি। যুদ্ধের শুরুর দিকে অসহনীয় কষ্ট সহ্য করে প্রশিক্ষণ নিই। প্রশিক্ষণ শেষে সহকারী প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।
সেসময় কয়েকশ মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশিক্ষণও দিয়েছি। আমার কাছে তৎকালীন এম এন এ সামছুল হুদা স্বাক্ষরিত ২১-১২-১৯৭১ সালের ওই ক্যাম্পের প্রাইমারি ট্রেনিংয়ের সার্টিফিকেটও রয়েছে। আমি ৬ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। অথচ দেশ স্বাধীনের পরে আমার স্বীকৃতি মেলেনি।
তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনলাইনে আবেদনের সুযোগ দিলেও দুর্গম চরাঞ্চলে বাড়ি থাকা এবং অসুস্থতার কারণে নির্ধারিত সময়ে অনলাইনে আবেদন করতে পারেননি তিনি।
২০১৫ সালের ২৯ জুন মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় বরাবর একটি লিখিত আবেদন করেন সফিয়ার রহমান। মন্ত্রণালয় ওই আবেদনটি পরের দিন ৩০ জুন গ্রহণ করেন। যার ডিজি নম্বর ২২২০৯। কিন্তু এক বছরের অধিক সময় পার হলেও এ ব্যাপারে কোন অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশ হয়েছেন এ যোদ্ধা।
প্রতিবেশী মজিবর রহমান জানান, সফিয়ার পানি উন্নয়ন বোর্ডে দীর্ঘদিন অপারেটর পদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করেছেন। সময় সুযোগের অভাবে তিনি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অর্ন্তভুক্ত হতে পারেননি। অভাব অটনের মাঝে সফিয়ার তার ৭ ছেলেমেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেও স্বীকৃতি মেলেনি তার।
সফিয়ার রহমানের স্ত্রী সালেহা বেগম বলেন, শাশুড়ি বলেছেন যখন আমার স্বামী মুক্তিযুদ্ধে গেছেন তখন টানা ৩ মাস রোজা রেখেছেন তিনি। যুদ্ধ শেষে আল্লাহ যেন তার সন্তানকে ফিরিয়ে আনেন এ দোয়াও করেছেন। এসেছেন ঠিকই কিন্তু স্বীকৃতি মেলেনি আজো। সরকারের কাছে কোন সুযোগ-সুবিধা চাইনা। আমার স্বামীকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিলেই খুশি।
এদিকে মরার আগে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চেয়ে মো. সফিয়ার রহমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজাম্মেল হকের কাছে আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এটাই অনুরোধ তিনি যেন বিষয়টি বিবেচনা করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার আব্দুল বাতেন সরকার বলেন, তার আবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের জন্য উপজেলা পর্যায়ে পাঠালে বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে সংশ্লিষ্ট কমিটি।
নাজমুল হোসাইন//এএম/পিআর