৩ ডিসেম্বর : ২১ জনে মুক্ত করেছিল বরগুনা


প্রকাশিত: ০৪:৪৪ এএম, ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬

আজ ৩ ডিসেম্বর বরগুনা হানাদার মুক্ত দিবস। একাত্তরের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণের মুখে বরগুনায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদাররা। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা ফজরের আজানকে টাইম কোড ধরে এক যোগে ওপেন ফায়ার করে দখলে নেয় বরগুনা থানা।

এসময় মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে নিহত হয় শামসুল হক রাজাকার ওরফে শামসু রাজাকার। গণ আদালতে বিচারের পর ফায়ারিং স্কোয়াডে বরগুনার কুখ্যাত রাজাকার আজিজ মাস্টার, হোসেন মাস্টার, মোতালেব মাস্টার এবং আজিজ কেরানিকে হত্যা করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বরগুনার বিভিন্ন থানা ও তৎকালীন মহাকুমা সদরে পাক বাহিনী অবস্থান করে পৈশাচিক নারী নির্যাতন ও নির্বিচারে গণহত্যা চালায় এবং ১৯৭১সালের ২৯ ও ৩০ মে বরগুনা জেলখানায় ৭৬ জনকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে। সময়ের ব্যবধানে কয়েক মাসের মধ্যেই বরগুনার মুক্তিযোদ্ধারা শক্তি অর্জন করে মনোবল নিয়ে এলাকায় ফিরে আসেন। বরগুনা, বামনা, বদনীখালী ও আমতলীতে যুদ্ধের পরে পাকবাহিনীর সদস্যরা বরগুনা ট্রেজারি, গণপূর্ত বিভাগের ডাকবাংলোয়, জেলখানা ও থানায় অবস্থান নেয়।

Barguna

মুক্তিযুদ্ধের সময় বরগুনা ছিল নবম সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত বরগুনার বামনা উপজেলার বুকাবুনিয়া সাব-সেক্টরের অধীনে। বরগুনার বুকাবুনিয়ার মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১ এর ২ ডিসেম্বর রাতে বরগুনা বেতাগী থানার বদনীখালী বাজারে আসেন। এরপর রাত তিনটার দিকে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সত্তার খানের নেতৃত্বে ২১ জন মুক্তিযোদ্ধা নৌকা যোগে বরগুনার খাকদোন নদীর পোটকাখালী এলাকায় অবস্থান নেন। পরে রাতেই কারাগার, ওয়াপদা কোলনী, জেলা স্কুল, সদর থানা, ওয়ারলেস স্টেশন, এসডিওর বাসাসহ বরগুনা শহরকে কয়েকটি উপ-বিভাগে ভাগ করে ফজরের আজানকে টাইম কোড করে এক যোগে ছয়টি স্থান থেকেই হামলা শুরু করেন।

এ সময় দলনেতা সত্তার খান ছিলেন কারাগার এলাকায়। এসময় তিনি জেলখানায় অবস্থানরত পুলিশ ও রাজাকারদের আত্মসমর্পণ করিয়ে এসডিও অফিসের সামনে নিয়ে আসেন। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা গিয়ে স্বাধীনতাকামী তৎকালীন এসডিও আনোয়ার হোসেনকে আত্মসমর্পণ করান। দুপুর বারোটার দিকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশাসনিক দায়িত্ব এসডিওকে সাময়িকভাবে বুঝিয়ে দিয়ে অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে বুকাবুনিয়া সাব-সেন্টারে চলে যান।

মুক্তিযোদ্ধা মো. আনোয়ার হোসেন মনোয়ার বলেন, একাত্তরের সেই রণাঙ্গনের কথা মনে পড়লে আজও আমাদের চোখে পানি এসে যায়। মাত্র ২১ জনের একটি দল নিয়ে আমরা বরগুনাকে মুক্ত করেছিলাম। আমাদের প্রবল আক্রমণের এক পর্যায়ে আত্মসমর্পণ করেতে বাধ্য হয়েছিলো অর্থশতাধিক রাজাকার ও পুলিশ।

Barguna

মুক্তিযোদ্ধা সুখরঞ্জন শীল বলেন, বরগুনার গণপূর্ত বিভাগের ডাকবাংলোয় নারীদের ধরে এনে পাশবিক নির্যাতন চালাত হানাদাররা। ১৯৭১ সালের ২৯ ও ৩০ মে স্থানীয় নিরীহ অধিবাসীদের বন্দী করে বরগুনা জেলখানায় গণহত্যা চালায় পাক হানাদাররা। পাকিস্তানি বাহিনীর  গুলিতে গুরুতর আহত অবস্থায় লাশের স্তুপ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে পালানোর সময় স্থানীয় অধিবাসী কেস্ট ডাক্তারকে কোদাল দিয়ে নৃসংশভাবে পিটিয়ে হত্যা করে রাজাকাররা।

মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান মিয়া বলেন, শহীদদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। তাদের ঋণ শোধ করার নয়। আমরা শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছি। তাদের রক্তের ও মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। কিন্তু শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের অভাব অনটন দেখে কষ্ট লাগে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, তিনি যেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেন।

বরগুনার জেলা প্রশাসক ড. মোহা. বশিরুল আলম বলেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মত্যাগ কোনো দিন ভুলবার নয়। শ্রদ্ধা অবনত চিত্তে তাদের যুগ যুগ ধরে স্মরণ করে যেতে হবে আমাদের। তবে শহীদ পরিবারকে ভাতা দেয়ার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের। তবু আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে শহীদ পরিবারের জন্য যাতে ভাতার ব্যবস্থা করা যায় সে বিষয়ে কথা বলবো।

আরএআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।