আজও স্বীকৃতি পায়নি ঢাবির শহীদ বুদ্ধিজীবী সাদেকের পরিবার
স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও স্বীকৃতি পায়নি শহীদ বুদ্ধিজীবী শিক্ষক মোহাম্মদ সাদেকের পরিবার। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ভয়াল কালো রাতে তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ সাদেক নৃশংসভাবে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোয়ার্টারে শহীদ সাদেকের পরিবার থাকত দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই কোয়ার্টারটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার অসহায় স্ত্রী-সন্তানদের বরাদ্দ দেয়া হলেও ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে সেই বাড়ি থেকে ওই পরিবারকে বিতাড়িত করা হয়।
বিয়ের মাত্র ৮ বছরেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে স্বামীকে হারান সামসুন্নাহার বেগম। এখন ২ ছেলে ও ২ মেয়ে নিয়ে তার সংসার। বড় ছেলে মোহাম্মদ কামরুল হাসান কুমিল্লা কোটবাড়িস্থ বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) যুগ্ম-পরিচালক।
বড় ছেলের বাসভবনে সম্প্রতি জাগো নিউজের এ প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপচারিতায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্বামীর স্বীকৃতি আদায়ে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
সামসুন্নাহার বেগম বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার ক্ষমতায় থাকার পরও একজন শহীদ বুদ্ধিজীবী শিক্ষকের স্বীকৃতি পেতে আর কতকাল আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। এখন মৃত্যুর আগে শহীদ স্বামী সাদেকের সরকারি স্বীকৃতি দেখে মরতে চাই।
সামসুন্নাহার বেগম জানান, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতীর জনক বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে আমার স্বামী ছোট ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরে তিনি আমাকে বললেন, দেশে হয়তো যুদ্ধ হবে। অনেক লোক মারা যাবে। আমিও হয়তো থাকবো না।
শেখ সাহেব যে সংগ্রামের ডাক দিয়েছেন এতে দেশ একদিন স্বাধীন হবেই। তুমি আমার ছেলে-মেয়েদের খেয়াল রাখবে। আমার ছেলে-মেয়েরা স্বাধীন দেশে বড় হবে, এটাই আমার চাওয়া-পাওয়া।
পরে ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোয়ার্টারের ১১নং ভবনে আমাদের ঘরে ঢুকে আমার চোখের সামনে তাকে (সাদেক) গুলি করে। এসময় তার দুই হাত খণ্ড হয়ে যায়। পরে বুকে গুলি করলে তিনি চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারা যান। রক্তাক্ত হয়ে পড়ে থাকেন ঘরের মেঝেতে।
পরে কারফিউ যখন শিথিল হয় তখন একটি পুরনো চাঁদর দিয়ে আমার মামা ও আত্মীয়-স্বজনসহ ৮-১০ জন মিলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় (ফুলার রোড) সমাধিস্থ করেন। সেই কালো রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবন ও হল গুলোতেও চলে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। হত্যার শিকার হন অনেক শিক্ষক-ছাত্র-ছাত্রী ও কর্মকর্তা কর্মচারী।
৪৫ বছরেও স্বামীর স্বীকৃতি না পাওয়ার বেদনা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, বিয়ের মাত্র ৮ বছরেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে আমার স্বামীকে হারিয়েছি। এরপর থেকে খেয়ে না খেয়ে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে দিন কাটিয়েছি। এখন আমার নিজস্ব কোনো জমি নাই, ঘর নাই, বাড়ি নাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোয়ার্টারে আমরা ছিলাম, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই কোয়ার্টারটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু রহস্যজনক কারণে ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে ওই বাড়ি থেকে আমাদেরকে বিতাড়িত করা হয়। জীবনের শেষ বয়সে এসে এখন ছেলে মেয়েদের বাসায় ঘুরে ঘুরে দিন কাটাচ্ছি।
বাড়িঘর করার মতো আমার টাকা পয়সা নেই। আমার স্বামী শেখ সাহেবের ভক্ত ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর শেখ সাহেব পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শহীদ পরিবারকে ডেকেছেন। এর মধ্যে আমাদেরকে তিনি ২ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো আমাদের জন্য অনেক কিছুই করতেন।
প্রধানমন্ত্রীকে বলার মতো আমার কেউ নেই। কোনো মন্ত্রী বা এমপিও নেই। শেখ সাহেবের মেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক দয়ালু। তিনি চাইলে আমার জন্য অনেক কিছু করে দিতে পারেন। আমি চাই সরকার আমাকে ছোটখাট একটি ঘর করে দিক। শেষ বয়সে স্বামীর ওইটুকু স্মৃতি নিয়ে যেন মরতে পারি এজন্য শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্ত্রী হিসেবে সনদ, আবাসন ও সরকারি ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাদি দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।
এ ব্যাপারে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মাধ্যমে ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি আবেদন করেছেন, কিন্তু এ পর্যন্ত তার পরিবার কোনো সহায়তা পাননি।
এদিকে ৩য় পর্যায়ের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মারক ডাকটিকিটে তার স্বামীর (মোহাম্মদ সাদেক) ছবি সংযোজন করে প্রকাশ করা হয়। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১০-২০১১ সালের ক্যালেন্ডারে ‘স্মৃতিতে ৭১ : শহীদ শিক্ষকবৃন্দ’ শিরোনামে ২০ জন বুদ্ধিজীবীর মধ্যে মোহাম্মদ সাদেকের ছবিটি স্থান পায়। আপাতত স্বামীর জীবনের প্রতিদান এতটুকুই।
প্রসঙ্গত, মোহাম্মদ সাদেক ১৯৩৯ সালের ৩১ মে তৎকালীন ভোলা মহকুমার (বর্তমান ভোলা জেলা) দক্ষিণ ইলিশার দারোগার হাওলার সরবদ্দি মাঝি বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বিদ্যালয় শুরু হয় গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি পরানগঞ্জ হাইস্কুল ও ভোলা সরকারি স্কুলের ছাত্র ছিলেন।
১৯৫৪ সালে ভোলা সরকারি বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৫৬ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং একই কলেজ থেকে ১৯৫৮ সালে বিএ পাশ করেন। ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ১৯৬১ সালে বিএড এবং একই কলেজ থেকে ১৯৬২ সালে এমএড ডিগ্রি অর্জন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্র বিজ্ঞানে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৮-৫৯ সাল পর্যন্ত ভোলা জেলার পরাণগঞ্জ হাইস্কুলের সহকারি প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৯-৬০ সাল পর্যন্ত ভোলা জেলার ব্যাংকের হাট কো-অপারেটিভ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
ভোলার দৌলতখানে অবস্থিত পিটিআইতে তিনি ইনস্ট্রাক্টর পদে কাজ করেছিলেন। এরপর ১৯৬৫ সালে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। আমৃত্যু তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন।
ঘটনার সময় তিনি ওই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। একাত্তরের ২৫ শে মার্চ কালো রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কজন শিক্ষক পাক হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার শিকার হয়ে শহীদ হন মোহাম্মদ সাদেক তাদেরই একজন।
এফএ/পিআর