মুক্তিযোদ্ধা করিম মাঝির জীবন চলে চানাচুর বিক্রি করে
শরীয়তপুর সদর পৌরসভার চরপাতানিধি গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো. করিম শিকদার। মুক্তিযুদ্ধের সময় নৌকার মাঝি ছিলেন বলে এলাকায় তিনি করিম মাঝি নামেই পরিচিতি।
মো. করিম শিকদার শরীয়তপুর সদর পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের চরপাতানিধি গ্রামে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। স্ত্রী, তিন ছেলে, এক মেয়ে ও ছেলে বউ, নাতি-নাতনিসহ এগারো সদস্যের পরিবার তার। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য তিনি অবশেষে বেছে নিয়েছেন চানাচুর বিক্রির পেশা। হাটে বাজারে পথের ধারে চানাচুর বিক্রি করে যা রোজগার হয় তা থেকেই চলে তার সংসার।
তিনি জানান, ১৯৭১ সালে আট নম্বর সেক্টর কমান্ডার মাস্টার এইচ.এম ইদ্রিস আলীর নেতৃত্বে সেদিন যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই বীর সেনা। ১৯৭১ সালে তিনি শরীয়তপুরে মাঠ শ্রমিকের কাজ করতেন। তৎকালীন আট নম্বর সেক্টর ছিল নদীবহুল এলাকা। নদীনালা ও অসংখ্য খাল বিল মাকড়শার জালের মতো বিস্তৃর্ণ ছিল এই সেক্টর।
সড়ক পথের ব্যবস্থা ছিল খুবই নাজুক। এখানে যুদ্ধের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল একমাত্র নৌপথ। বর্ষাকালে নদ নদীগুলো ধারণ করতো ভয়ংকর এক রূপ।
ওই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের নৌপথে চলাচলের জন্য দক্ষ মাঝির প্রয়োজন পড়ে। যিনি অস্ত্র গোলাবারুদসহ মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে নিরাপদে পৌঁছে দিবেন। সে সময় এ রকম একজন মাঝি পাওয়া খুবই দুষ্কর ছিল। ঠিক তখনই মাস্টার এইচ.এম ইদ্রিস আলী তাকে নির্বাচিত করলেন।
করিম মাঝি ধানুকা, ডোমসার, ভোজেশ্বর, ভেদরগঞ্জ, বুড়িরহাট, ডামুড্যাসহ শরীয়তপুর-মাদারীপুর জলপথগুলো ছিল যার নখদর্পনে। তারপর করিম শিকদার নৌকার মাঝি পরিচয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন।
একদিন ধানুকা পোদ্ধার বাড়ি থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও অস্ত্রের চালান নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন ভেদরগঞ্জ অভিমুখে। তখন ঘোর বর্ষাকাল কৃত্তিনাশা নদী। ঘোর অন্ধকার রাতে নদীর মাঝপথে শুরু হয় উথাল পাথাল ঢেউ সেইসঙ্গে ঝড়ো হওয়া। তিনি শক্ত করে নৌকার হাল ধরেন। 
তুমুল বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ চমকানোর মাঝে হঠাৎ পাক সেনাদের গুলির শব্দে চমকে ওঠেন নৌকায় থাকা মুক্তিযোদ্ধারা। তারা বুঝছিলেন তাদের দিকেই ধেয়ে আসছে পাক সেনারা। কিছুক্ষণের জন্য থেমে যায় পাক বাহিনীর গুলির শব্দ। কয়েক ঘণ্টা অবস্থান কাটিয়ে করিম মাঝির নৌকা পৌঁছায় ক্যাম্পের নিকট।
এভাবেই মুক্তিযুদ্ধে শরীয়তপুর পূর্বমাদারীপুর অঞ্চলে নৌপথে মুক্তিবাহিনী ও অস্ত্র বহন করতেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের নৌপথে যাতায়াত চলত করিম মাঝির নৌকায়। এই সত্য ইতিহাস এ জনপদে স্বীকৃত। তবু করিম মাঝি রাষ্ট্রের খাতাপত্রে মুক্তিযোদ্ধা নন!
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল (কল্যাণ ও পূর্নবাসন) মহাসচিব মো. আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, করিম শিকদার একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের দুর্ভাগ্য যে এই মুক্তিযোদ্ধা আজও স্বীকৃতি পেলেন না।
তিনি আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধা করিম শিকদারের নাম প্রস্তাব দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও তিনি গেজেটভূক্ত হতে পারেননি।
এফএ/এমএস