জমি ফেরত ও হামলার বিচার দাবিতে অনড় সাঁওতালরা


প্রকাশিত: ০৪:৩৬ এএম, ০৬ জানুয়ারি ২০১৭

রংপুর চিনিকলের আওতাধীন গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের জমিতে বসতি গড়ে তোলা সাঁওতালদের উপর পুলিশি তাণ্ডব, হামলা ও উচ্ছেদের ঘটনার দুই মাস পূর্ণ হলো আজ। গত ৬ নভেম্বর চিনিকলের জমিতে আখ কাটা নিয়ে পুলিশ ও চিনিকল শ্রমিক-কর্মচারীর সঙ্গে সাঁওতালদের সংঘর্ষ হয়।

এতে পুলিশ, চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। এর মধ্যে নয় পুলিশ তীরবিদ্ধ ও গুলিবিদ্ধ হন চার সাঁওতাল। পরে গুলিবিদ্ধ তিন সাঁওতাল নিহত হন। এছাড়া এ ঘটনায় শতশত ঘর আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। সেই সঙ্গে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, শ্যালো মেশিন ও ধান-চালসহ জমিতে চাষ করা বিভিন্ন ফসল লুটপাট করা হয়।

কিন্তু ঘটনার দুই মাসেও এ ঘটনা কিছুতেই ভুলতে পারছে না সাঁওতালরা। হামলার স্মৃতি এখনো তাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। ঘটনার পর মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ার সাঁওতাল পল্লীতে আশ্রয় নেয় ক্ষতিগ্রস্ত ৪০০ শতাধিক সাঁওতাল পরিবার। সেখানে খোলা আকাশের নিচে খড়ের ঘর, ছাপড়া, ত্রিপল (তাবু), কলা পাতার ঘরের নিচে দিন কাটছে তাদের। এছাড়া অনেকে বিভিন্ন স্থানেও আশ্রয় নিয়েছে।

এদিকে, প্রতিনিয়ত ভয় আর আতঙ্কের সঙ্গে সঙ্গী হয়েছে হাঁড় কাপানো তীব্র শীত। ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতে একেবারে নাজেহাল হয়ে পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও নারী-পুরুষরা। তাছাড়া খেটে খাওয়া এসব মানুষ একেবারে কর্মহীন হয়ে পড়ায় খেয়ে না খেয়ে নানা কষ্ট আর দুর্ভোগে জীবন-যাপন করছেন। স্বাভাবিকতা ফেরেনি সাঁওতালদের জীবনযাত্রায়।

GAIBANDHA

তবে এসব মানুষ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও বাপ-দাদার জমি ফেরত পাওয়ার দাবিতে অনড়। তারা দৃঢ়তার সঙ্গে বলছেন, জীবন দিব তবুও বাপ-দাদার জমি কিছুতেই ছাড়ব না। বাপ-দাদার জমিতে বসতি করে  কষ্ট হলেও শান্তিতে থাকতে চাই। এ ঘটনার পর সাঁওতালদের পক্ষে গোবিন্দগঞ্জ থানায় দুটি মামলা হয়।

এতে সংসদ সদস্য, ইউএনও, ইউপি চেয়ারম্যান, চিনিকলের এমডিসহ ৩৩ জন নামীয় ও অজ্ঞাত আরও  চার-পাঁচ শতাধিক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। কিন্তু হামলার ঘটনার দুই মাসেও ধরা পড়েনি মূল অভিযুক্ত আসামিরা। এছাড়া উচ্চ আদালতের নির্দেশে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত টিমের তদন্তও শেষ হয়নি। ফলে বিচারের দাবি এখনও কেঁদে ফিরছে সাঁওতাল পল্লীতে।

তবে সাঁওতাল পল্লীতে আগুন ও হামলার ঘটনায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচার বিভাগীয় তদন্ত টিম তদন্ত শুরু করেছে।

গাইবান্ধা চিফ জুডিশিয়াল (মুখ্য বিচারিক হাকিম) মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত শুরু করেছেন। গত মঙ্গলবারও তিনি মাদারপুর ও জয়পুরপাড়ায় গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল সঙ্গে কথা বলেন। এসময় তিনি তাদের জবানবন্দি (সাক্ষ্য) রেকর্ড করেন। শুক্রবারেও তদন্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সরেজমিনে তদন্ত সম্পন্ন করেছে।

মাদারপুর গ্রামের গির্জার সামনে আশ্রয় নেয়া সাঁওতাল পরিবারের আমেনা হেমরন বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই মেয়েকে নিয়ে খামারের জমিতে ঘর তুলে বসবাস করে আসছিলাম। কিন্তু হামলা ও আগুনের ঘটনায় সব শেষ হয়েছে। এখন খোলা আকাশের নিচে কোনো রকম খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছি। তার উপর নতুন করে হামলার আতঙ্কে থাকতে হয় সবসময়।

GAIBANDHA

গির্জার সামনে আশ্রয় নেয়া টেডু টুডু বলেন, বাপ-দাদার জমি ছাড়ার দুই মাস অতিবাহিত হলেও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হচ্ছে। সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে এখনো নানা হুমকিতে থাকতে হচ্ছে। এছাড়া ঘটনার দু’মাস হলেও হামলাকারীদের গ্রেফতার করা হয়নি। তাছাড়া সাঁওতালদের জমি ফেরত দেয়ার বিষয়ও কোনো সমাধানের উদ্যোগ নেই।

শরনি কিসকো বলেন, হাতে কোন কাজ নেই। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এনজিও, ব্যক্তি ও বিভিন্ন সংগঠন চাল, ডাল, তেল, লবণসহ শুকনা যেসব খাবার দিয়েছে তা খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। বাপের ভিটেমাটি ছেড়ে দুই মাস ধরে নানা কষ্টে দিনাতিপাত করছি। দ্রুত আমাদের বিষয়ে স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

পলুস মাস্টার বলেন, আগুন দিয়ে ঘর জ্বালিয়ে দেয়া, ফসলি জমি, সম্পদ লুটপাটে ক্ষতিপূরণ ও হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে সব্বোর্চ্চ শাস্তির দাবি জানাই। এছাড়া সরকারের কাছে বাপ-দাদার জমির অধিকার ফিরে দেয়ার সমাধান চাই।

গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত কুমার সরকার বলেন, হামলার ঘটনায় সাঁওতালতের পক্ষে দায়ের করা মামলা ও পুলিশের দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে। এছাড়া উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলছে। এছাড়া সাঁওতালদের জীবন-যাত্রার মান যাতে স্বাভাবিক থাকে সে বিষয়ে পুলিশের নজরদারি রয়েছে।

আরএআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।