লেজে-গোবরে মাটিরাঙার চিকিৎসা ব্যবস্থা
চিকিৎসক সঙ্কটে নিজেই রোগী হতে চলেছে মাটিরাঙা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হাসপাতালটিতে কাগজে কলমে ৯ জন চিকিৎসকের পদায়ন থাকলেও সেবা চলছে মাত্র ১ জন চিকিৎসক দিয়ে। ফলে পার্বত্য খাগড়াছড়ির জনবহুল বৃহত্তম উপজেলা মাটিরাঙার প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার লোকের চিকিৎসা সেবা এখন চরম অনিশ্চিত।
চিকিৎসক সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করায় যেকোনাে সময় মারাত্মক বিপদ ঘটে যেতে পারে বলে চিন্তিত খোদ মাটিরাঙার সচেতন মহল।
মাটিরাঙা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে উপজেলার দূর্গম জনপদ থেকে অনেক কষ্টে অর্জিত টাকা পয়সা খরচ করে আসা রোগীদের ভিড় দেখা যায়। হাসপাতালের সহকারী মেডিকেল অফিসার অংচিংপ্রু চৌধুরী রোগি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।
কেউ কেউ চিকিৎসা নিতে দাঁড়িয়ে আছে, আবার কেউ কেউ বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। কার্যত সুরম্য অবকাঠামো আর সাইনবোর্ড ঝুলে থাকলেও চিকিৎসকের শূন্য পদে পদায়ন না হওয়ায় দেখা মিলছে না চিকিৎসক।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, মাটিরাঙা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারটি জুনিয়র কনসালটেন্ট ও মেডিকেল অফিসারের দুটি পদই শূন্য। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অ্যানেস্থেসিয়া সর্বোপরি মেডিকেল অফিসারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ গুলোতে চিকিৎসক সঙ্কট থাকায় প্রতিনিয়ত এলাকার গরীব দুঃস্থ রোগীদের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে।
হাসপাতালে কর্তব্যরত একমাত্র চিকিৎসক ও আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ছাড়া সম্প্রতি ডেপুটেশনে থাকা একজন চিকিৎসক ও দুইজন স্বাস্থ্য সহকারীর উপর ভর করেই চলছে উপজেলার স্বাস্থ্য সেবা। এ অবস্থায় তাদের বক্তব্যেও ক্ষোভ ফুটে উঠেছে।
তবে খোঁজ নিযে জানা গেছে, মাটিরাঙা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. খায়রুল আলমের অব্যাহত অনিয়ম, চরম গাফিলতি এ হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামোকেও লেজে-গোবরে করে রেখেছে। তিনি কবে আর কখন হাসপাতালে আসেন আর যান তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি হাসপাতালের কর্মরত কেউ।
হাসপাতালের বর্তমান চিকিৎসক সঙ্কটে হতাশা ব্যক্ত করে হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক অংচি চৌধুরী বলেন, খুবই সমস্যায় আছি। হাসপাতালে আসা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে এখন আমরা যারা আছি তারা পরিবার থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। ইচ্ছা থাকলেও পারিবারিক ও সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারি না। অনেকটা হাফিয়ে উঠেছি বলতে পারেন। তবে তিনি জরুরি ভিত্তিতে শুন্যপদে চিকিৎসক পদায়নে উপর মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
একই অবস্থা চলমান আছে উপজেলার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতেও। গুইমারা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ১ জন, আলুটিলা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ১ জন, বড়নাল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ১ জন, তবলছড়ি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ২ জন এবং তবলছড়ির গৌরাঙ্গ পাড়া স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ১ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও সবকটি পদই শুন্য রয়েছে। চিকিৎসা বঞ্চিত মানুষগুলো অনেকটা বাধ্য হয়েই ভিড় করছে সেনাবাহিনী পরিচালিত বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে।
মাটিরাঙা স্বাস্থ্য সেবার বিষয়ে জানতে চাইলে মাটিরাঙা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাটিরাঙা পৌরসভার মেয়র মো. শামছুল হক অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার গাফিলতি আর দায়িত্বে অবহেলার কারণে হাসপাতালটির চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
তিনি বলেন, এখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত চিকিৎসা সেবার নামে প্রতারিত হচ্ছে। এ অবস্তা চলতে থাকলে একসময় তা বিক্ষোভেও রূপ নিতে পারে। ডা. মো. খায়রুল আলম মাসের বেশির ভাগ সময়ই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন এমন অভিযোগ করে তিনি অবিলম্বে এ হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগের দাবি জানান।
এ বিষয়ে মাটিরাঙা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. খায়রুল আলমের সঙ্গে কথা বলতে নানাভাবে চেষ্টা করা হলেও তাকে না পাওয়ার কারণে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন ডা. নীশিত নন্দী মজুমদার বলেন, এ নিয়ে বরাবরই লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু সরকার চিকিৎসক না দিলে আমার করার কী থাকতে পারে।
ডা. মো. খায়রুল আলমের কর্মস্থলে ধারাবাহিক অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. নীশিত নন্দী মজুমদার বলেন, তিনি খাগড়াছড়ির স্থানীয় বাসিন্দা। তাকে কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত থাকার জন্য বহুবার সতর্ক করা হয়েছে।
এফএ/এমএস