৮ যাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা : চার্জশিট দাখিল হয়নি ২ বছরেও
দেশব্যাপী বহুল আলোচিত যাত্রীবাহী নৈশকোচে পেট্রোল বোমা হামলা চালিয়ে ৮ যাত্রীকে পুড়িয়ে মারার ঘটনার ২ বছর আজ ৩ ফেব্রুয়ারি। ২ বছর অতিবাহিত হলেও দেশব্যাপী বহুল আলোচিত এ পেট্রোলবোমা হামলার চার্জশিট এখনো আদালতে দাখিল করা হয়নি।
নিহতের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত করা এবং ময়নাতদন্ত ও ভিসেরা প্রতিবেদনের জন্য দৌড়ঝাঁপ করেই পুলিশের কেটেছে ২ বছর। পুলিশ এখনো হাতে পায়নি নিহত ২ জনের ভিসেরা রিপোর্ট।
২০১৫ সালের এই দিনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ডাকা দেশব্যাপী লাগাতার হরতাল-অবরোধ চলাকালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে যাত্রীবাহী নৈশকোচে পেট্রলবোমা হামলা চালিয়ে ঘুমন্ত ৮ যাত্রীকে পুড়িয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
হত্যা ও নাশকতার অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা পৃথক দুটি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতা এবং জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ও বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের স্থানীয় নেতাকর্মী অভিযুক্ত হতে পারেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
সেদিন নিহত হয়েছিলেন যারা
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের ডাকা লাগাতার হরতাল-অবরোধ চলাকালে ২০১৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ভোর রাতে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী আইকন পরিবহনের একটি নৈশকোচ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার জগমোহনপুর এলাকায় আসার পর নাশকতাকারীদের নিক্ষিপ্ত পেট্রলবোমা হামলায় ঘটনাস্থলে ৭ জন এবং পরে ঢামেকের বার্ন ইউনিটে রাশেদুল ইসলাম নামের আরও একজনের মৃত্যু হয়।
ঘটনাস্থলে নিহতরা হচ্ছেন, যশোরের গণপূর্ত বিভাগের ঠিকাদার জেলা সদরের ঘোপসেন্ট্রাল রোডের বাসিন্দা হাজী রুকনুজ্জামানের ছেলে নুরুজ্জামান পাপলু (৫০), তার মেয়ে যশোর পুলিশ লাইন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী মাইশা তাসলিম (১৪), কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার গাইনাকাটা গ্রামের মৃত ছিদ্দিক আহম্মদের ছেলে আবু তাহের (৩৮) ও একই গ্রামের সালেহ আহম্মদের ছেলে আবু ইউসুফ (৪৫), নরসিংদীর পলাশ উপজেলার বালুরচর পাড়ার জসিম উদ্দিন মানিকের স্ত্রী আসমা আক্তার (৩৮) ও তার ছেলে মাহমুদুল হাসান শান্ত (১৩) এবং শরীয়তপুর জেলার ঘোষেরহাট থানার দক্ষিণ গজারিয়া গ্রামের মৃত নজরখার ছেলে ওয়াসিম (৩৮)। নিহতদের মধ্যে ওয়াসিম ছাড়া সকলের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই হস্তান্তর করায় পরবর্তীতে মামলা তদন্তে দেখা দেয় বিপত্তি।
মামলায় এজাহারে অভিযুক্ত যারা
আলোচিত ওই নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুজ্জামান হাওলাদার বাদী হয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ও চৌদ্দগ্রামের সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে প্রধান আসামি এবং বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, দলের কেন্দ্রীয় নেতা ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, রুহুল কবির রিজভী ও সালাহউদ্দিন আহমেদকে হুকুমের আসামি করে ওই দুটি মামলায় ১১২ জনের নাম উল্লেখসহ ১৪২ জনকে আসামি করা হয়।
এরই মধ্যে এ মামলায় পুলিশ ২৫ জনকে গ্রেফতার করেছে। এদের মধ্যে জাকির, মোতালেব ও আলমগীর নামে ৩ জন আসামি ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আসামিদের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে শাহাবুদ্দিন নামে এক শিবির নেতা এবং সড়ক দুর্ঘটনায় সোহেল নামে এক আসামি মারা গেছেন।
যে কারণে চার্জশিট প্রদানে বিলম্ব
বৃহস্পতিবার বিকেলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ইব্রাহীম জানান, এ নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পর নিহতদের মধ্যে ওই সময় একজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয় এবং অপর সাতজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত না করেই তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
কিন্তু মামলার বিচারের প্রক্রিয়ায় ময়নাতদন্ত ছাড়া পরবর্তীতে জটিলতা দেখা দেয়ার আশঙ্কায় পড়ে আদালতের নির্দেশে পুলিশ কক্সবাজারের ইউসুফ ও রাশেদুল ইসলামের মরদেহ ২০১৫ সালের ২১ নভেম্বর, যশোরের নুরুজ্জামান পপলু ও তার মেয়ে মাইশার মরদেহ গত বছরের (২০১৬) ২১ জানুয়ারি, শরীয়তপুরের ওয়াসিমের মরদেহ গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি এবং নরসিংদীর আসমা ও তার ছেলে মাহমুদুল হাসান শান্তের মরদেহ গত বছরের ১ মার্চ কবর থেকে উত্তোলন করে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়।
এরই সকল মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলেও ২ জনের ভিসেরা প্রতিবেদন না পাওয়ায় চার্জশিট প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।
চৌদ্দগ্রাম থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফয়সাল জানান, ঘটনার পর নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্ত না করায় পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে মরদেহ উত্তোলন করতে গিয়ে মামলার তদন্তে কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছে, তবে মামলার তদন্ত এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।
এফএ/পিআর