পালিয়ে বিয়ে করে মৃত্যুর প্রহর গুণছে হাবিবা


প্রকাশিত: ০১:৫০ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। একটু পর পর চোখ খুলছেন আর পাতা ফেলছেন। মুখে কোনো কথা নেই, যেন বাকরুদ্ধ! নড়াচড়ার শক্তি নেই শরীরে। তবে চোখে মুখে নিদারুণ অস্বস্তি আর যন্ত্রণার ছাপ। একটু পর পর বৃদ্ধা মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। এভাবেই হাসপাতালের বেডে ছটফট করছেন গৃহবধূ হাবিবা খাতুন।

যৌতুকের বর্বর নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ হাবিবা খাতুন। এখন নওগাঁ সদর হাসপাতালের ৫নং কেবিনে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। বাকরুদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছেন তিনি।   

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নওগাঁ শহরের দক্ষিণ হাট-নওগাঁ মহল্লার হাফিজুর রহমানের মেয়ে হাবিবা খাতুনের সঙ্গে একই মহল্লার শামসুজ্জোহা খান বিদ্যুতের ছেলে তামভি হাসান অভির প্রেমের সম্পর্ক হয়।

হাবিবা নওগাঁ পিএম বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী। হাবিবা পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি, অষ্টম শ্রেণিতে জিপিএ-৫ এবং ২০১৫ সালে জেলা মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করে। আর অভি উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশুনা করেছে।

গত বছরের ২৩ আগস্ট হাবিবা স্কুলে যাওয়ার নাম করে প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেন। বিয়ে পড়ান কাজী রফিকুল ইসলাম। বিয়ের পর থেকে হাবিবা বাবার বাড়ি যোগাযোগ রাখতেন না। কিন্তু বিয়ের তিন মাসের মাথায় হাবিবাকে বাবার বাড়ি থেকে দুই লাখ টাকা নিয়ে আসতে বলে অভির পরিবার।

এতোগুলো টাকা হাবিবার বাবা গৃহশিক্ষক হাফিজুর রহমানের পক্ষে দেয়া সম্ভব ছিল না। এ নিয়ে হাবিবাকে প্রায় নির্যাতন করতো স্বামীর পরিবার।

গত ৩০ নভেম্বর বিকেলে হাবিবার বাবার কাছে খবর পাঠানো হয় তার মেয়ে গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু ওদিন হাবিবাকে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জীবিত বলে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করে।

এর চারদিন পর অচেতন হাবিবাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যায় তারা। মেয়েকে দেখতে হাবিবার পরিবার রাজশাহীতে গেলে হাসপাতালে দেয়া ঠিকানায় খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এরপর নওগাঁর স্থানীয় কমিশনার মজনু হোসেন ও ছেলের বাবা শামসুজ্জোহার কাছে যান বাবা হাফিজুর। তাদের সহযোগিতায় ছয়দিন পর রাজশাহীতে তামভির এক আত্মীয়য়ের বাসায় অচেতন হাবিবাকে পাওয়া যায়।

এরপর হাফিজুর রহমান তার মেয়েকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। নির্যাতনের শিকার হাবিবার মাথার পেছনে ও কোমরে বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি তার দুটি দাঁতও ভেঙে ফেলে শ্বশুর বাড়ির লোকজন।

বর্তমানে তাকে খাবার দেয়া হচ্ছে নাক দিয়ে। কথা বলতে পারছে না। শরীরের কোনো অংশই কাজ করছে না তার। ১৬ দিন লাইফ সাপোর্টে রাখার পর তাকে চিকিৎসকরা হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তির পরামর্শ দেন। সেখানে তিনদিন থাকার পর বাড়ি নিয়ে যেতে বলেন চিকিৎসকরা। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আবার নওগাঁ সদর হাসপাতালে ৫ নং কেবিনে হাবিবাকে ভর্তি করা হয়।

হাবিবার বাবা হাফিজুর রহমান বলেন, মেয়ের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। নাকে নল দিয়ে খাওয়াতে হচ্ছে। হাত পা কাজ করছে না। তার শরীরে কোনো শক্তি নেই। কথাও বলতে পারে না। শুধু অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। মেয়ের এমন অবস্থার জন্য যারা দায়ী তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি।

হাবিবার মা সফুরা আখতার বলেন, যৌতুকের জন্য আমার মেয়েকে বিভিন্নভাবে শারীরিক নির্যাতন করেছে ছেলের পরিবার। রাজশাহীতে নেয়ার পর থেকেই মোবাইলে ছেলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয় হাবিবা সুস্থ আছে। কিন্তু দিনের পর দিন আমার মেয়েয়েকে চিকিৎসা না দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছে তারা।

নওগাঁ সদর হাসপাতালের অর্থডেডিক সার্জারি ডা. আরশাদ হোসেন বলেন, মেয়টির অবস্থা গুরতর। এই হাসপাতালে এ রোগীর চিকিৎসা সম্ভব নয়। রোগীর যে অবস্থা তাতে মেডিকেল কলেজ অথবা নিউরোলজিস্ট হাসপাতালে নেয়া হলে খুবই ভালো হয়। সাময়িকভাবে এখানে তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব তাকে উন্নত চিকিসার ব্যবস্থা করা জরুরি।

নওগাঁ সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোরিকুল ইসলাম বলেন, ঘটনায় তিনজনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। মামলার পর অভিযুক্ত ছেলে অভি ও তার বাবা শামসুজ্জোহা খানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ছেলের মা সৈয়দা তাহমিনাকে গ্রেফতারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

আব্বাস আলী/এএম/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।