মনোবলই ছিল সাহিদার পুঁজি
অভাবের সংসার। পরিবারে ছয় ভাই বোন তাদের। পড়াশুনার সুযোগ না থাকায় ৫ম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয় সাহিদা বেগমের। সাহিদার বাবা সুরুজ্জামান। তিনি নীলফামারীর জেলার ডিমলা উপজেলার খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব কামারপাড়া গ্রামে বসবাস করেন।
ছয় ভাইবোনের মধ্যে সাহিদা বেগম দ্বিতীয়। বাবা কৃষক, দিন মজুরের কাজ করে স্বল্প আয় দিয়ে সংসার চলে। সংসারে জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় সাহিদা বেগমের লেখাপড়ার সুযোগ হয়নি।
বাবা তাকে স্কুলে ভর্তি করেছিল। কিন্ত পঞ্চম শ্রেণি পাস না করতেই সংসারে অভাবের কারণে একই ইউনিয়নের মেম্বারপাড়া গ্রামে মইনুল হোসেনের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেন।
শ্বশুর বাড়িতে তার স্বামীর আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। অর্ধাহারে অনাহারে তারা দিনযাপন করতেন। তার স্বামী দিন মজুরের কাজ করে যে অল্প আয় করতেন তা দিয়েই সংসার চলতো।
অভাবের কারণে সংসারে প্রতিনিয়ত অশান্তি লেগেই থাকতো। এছাড়া যৌতুকের জন্য তাকে পরিবারের লোকদের কাছ থেকে নানাভাবে অত্যাচার সইতে হতো।
এতো অভাব কষ্ট দূর করে সাহিদা বেগম একটু সুখের সন্ধান করেছিলেন। অন্য দশজন নারীর মতো তিনিও সাধারণভাবে সুখে শান্তিতে স্বামীর সংসার করতে চাইতেন। অভাব কষ্টকে জয় করার প্রবল ইচ্ছে ছিল তার।
এমন মনোবলকে পুঁজি করে কীভাবে আয়মূলক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবেন এমনটাই চিন্তা করতে থাকেন। ২০০৬ সালে বাবার বাড়ি থেকে একটি গরু এনে পালতে শুরু করেন তিনি।
২০১৪ সালে পল্লীশ্রী রি-কল প্রকল্প বাস্তবায়নে মেম্বারপাড়া সোনালী জনসংগঠনের মাধ্যমে নেতৃত্ব এবং জীবিকায়নের উন্নতি করে সহনশীল কমিউনিটি গঠন করা হয়। পরে সোনালী জনসংগঠনে শাপলা দুধ উৎপাদক দল গঠন করা হয়। ওই দলের সদস্য হিসেবে সাহিদা বেগম মিল্ক কালেকশন সেন্টারের দায়িত্ব পান।
এর মাধ্যমে নতুন করে তার জীবন জীবিকায়নের উন্নয়নের রাস্তা খুঁজে পান সাহিদা। অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং হিসাব নিকাশে ভালো বিধায় দলের সদস্যরা সাহিদাকে ওই মিল্ক কালেকশন সেন্টারের ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব দেয়।
খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের মেম্বারপাড়া গ্রামে ১৪০টি পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। এখানে অধিকাংশ পরিবারের নারীরা গাভি পালনের সঙ্গে জড়িত।
নারীরা পারিবারিক কাজের পাশাপাশি গাভি পালন করেন। এলাকার দুগ্ধ খামারীরা পাশের টুনিরহাটে দুধ বিক্রয় করতেন। প্রয়োজনীয় কাজ ফেলে পরিবহন খরচ দিয়ে বাজারে দুধ নিয়ে যেতে হতো তাদের।
একপর্যায়ে গাভি পালনের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে খামারীরা। কারণ দুধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা এবং বিক্রয়ে নির্দিষ্ট কোনো বাজার না থাকায় তারা লাভের মুখ দেখতে পেতো না।
কিন্ত সাহিদা বেগমের মিল্ক কালেকশন সেন্টার গ্রামের মানুষের এই ধারণাটা বদলে দেয়। তিনি প্রমাণ করেন গাভি পালন এবং দুধ উৎপাদন একটি লাভজনক পেশা।
গাভি পালন করে মেম্বারপাড়া গ্রামের নারীরা তাদের ভাগ্যের চাকা বদলে দিয়েছে। ওই গ্রামের নারীরা এখন আয়মূলক কাজের সঙ্গে জড়িত হয়েছে এবং প্রতিদিন তাদের উৎপাদিত দুধ মিল্ক কালেকশন সেন্টারে বিক্রয় করে নগদ অর্থ হাতে পাচ্ছে।
অর্থনৈতিকভাবে আগের চেয়ে অনেকটায় স্বাবলম্বী হয়েছে তারা। নিজেদের পছন্দমতো প্রয়োজনীয় চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারছে তারা। ছেলেমেয়ের জন্য লেখাপড়ার প্রয়োজনীয় খরচ চালাতে পারে। এলাকার হতদরিদ্র নারীরা অনেকেই ব্যাংকে সঞ্চয় করছে। যার ফলে নারী নেতৃত্ব এবং সম্পদে নারীর প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাহিদা বেগম এখন মোটামোটি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। নিজের আয়ের টাকা থেকে আশা সংস্থায় একটি ডিপিএস করেছে। সংসারের জন্য তিনি প্রয়োজনীয় খরচ করতে পারেন।
সাহিদা বেগমের নিজের বাড়ির জায়গা নেই। তার স্বপ্ন নিজের নামে জমি ক্রয় করে একটি বাড়ি তৈরি করবেন। বর্তমানে তার চারটি গরুর মধ্যে একটি গাভি এবং এই গাভির ১০ কেজি দুধ উৎপাদন হয়।
ব্যবসার লাভের টাকা জমিয়ে নিজের নামে এক বিঘা জমি বর্গা নিয়ে ভুট্টা চাষ করেছেন তিনি। যা থেকে ভালো আয় করবে এবং আগামীতে তার উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদী তিনি।
তার উন্নতি দেখে গ্রামের অন্যান্য নারী অনুপ্রাণিত হয়ে বিভিন্ন প্রকার আয়মূলক কাজের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন এবং তারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
বর্তমানে সাহিদা বেগমের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ায় তার জীবনের পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ করতে পেরেছেন। তার স্বামীও তাকে ব্যবসার কাজে সহযোগিতা করছেন। তার স্বামীর সহযোগিতা পেয়ে সাহিদা বেগম পারিবারিক ও সামাজিক বাধাগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন।
জাহেদুল ইসলাম/এএম/পিআর