ঢাকায় মশার বিপৎসংকেত, মার্চে আরও বাড়বে উপদ্রব

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ০১:৪৪ পিএম, ১০ মার্চ ২০২৬
রাজধানীর মনিপুরীপাড়ায় লার্ভিসাইডিং ও ফগিং কার্যক্রম। ছবি: ডিএনসিসি

রাজধানীর গুলশান-১-এর ২৪ নম্বর রোড। এ রোডের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে নান্দনিক নকশার বহু ভবন। প্রতি ভবনের সামনের অংশে রয়েছে বারান্দা। এখানে শোভা পেয়েছে বাগান বিলাশসহ বাহারি রঙের ফুল গাছ। বসার জন্য আছে চেয়ার ও ছোট্ট টেবিল। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সকাল-বিকেল বারান্দায় সময় কাটান বাসিন্দারা। কিন্তু সন্ধ্যা নামতেই বারান্দা ছেড়ে দ্রুত ঘরের ভেতর চলে যান তারা। বাসার সব দরজা-জানালা বন্ধ করে দেন। সকাল হওয়ার আগ পর্যন্ত এভাবেই আবদ্ধ থাকেন তারা।

ঠিক কী কারণে ঘরের ভেতর এভাবে আবদ্ধ থাকেন, তা জানতে চাইলে গুলশানের বাসিন্দা আনোয়ারুল ইসলাম জানান, প্রতিদিন সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের আগে চারদিক থেকে মৌমাছির মতো হামলে পড়ে মশা। হাত-পা নাড়া না দিলে মুহূর্তের মধ্যে রক্ত চুষে নেয়। ফলে সন্ধ্যার আগ থেকে সকাল পর্যন্ত বারান্দায় আর বসা যায় না। অথচ গুলশানে দেশের অভিজাত শ্রেণির মানুষের বসবাস।

বনানী লেকের পশ্চিম পাশে কড়াইল বস্তি। এখানে প্রায় চার লাখ নিম্নআয়ের মানুষের বাস। বস্তির অধিকাংশ ঘর টিন শেডের। ফলে মশার আক্রমণ থেকে রক্ষায় দরজা-জানালা বন্ধ করলেও ফাঁকা স্থান দিয়ে মশা ঘরে ঢুকে পড়ছে। ঘরে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাইকে মশা আক্রমণ করছে।

মশার উপদ্রব

কড়াইল বস্তির বাসিন্দা হান্নান মিয়ার অভিযোগ, ‘এ মশার বড় প্রজননস্থল গুলশান-বনানী লেক। এ লেকের মশা ধনী-গরিব কাউকে ছাড়ে না। সন্ধ্যা হলে মৌমাছির মতো ঝাঁকে ঝাঁকে বাসাবাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। দিনের বেলাও বাসায় মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হয়। অথচ গুলশানেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান কার্যালয়, নগর ভবন। এখানেই যদি মশার এমন উপদ্রব হয়, তা হলে সারা ঢাকা শহরে মশা কেমন, তা আন্দাজ করলেই বোঝা যায়। এক কথায় মশা নিধনে ডিএনসিসি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) পুরাই ব্যর্থ।’

ঢাকায় সাধারণত তিন প্রজাতির মশার বিস্তার দেখা যায়, কিউলেক্স, এডিস ও অ্যানোফিলিস। কীটতত্ববিদরা বলছেন, শুষ্ক মৌসুমে কম শীত ও দ্রুত তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নর্দমা-জলাশয়ের দূষণের কারণে কিউলেক্স মশা বেড়ে যায়। আবার তাপমাত্রা বাড়লে কিউলেক্সের জীবনচক্র দ্রুত সম্পন্ন হয়, স্ত্রী মশার রক্তপানের প্রবণতা বাড়ে, ডিম উৎপাদন বাড়ে, ফলে বিস্তারও বাড়ে। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে এডিসের কামড়ে ডেঙ্গু বাড়ে। তখন মশার কামড়ে ম্যালেরিয়াও হয়।

মশা নিয়ে গবেষণার চিত্র যা বলছে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার। তিনি ২৬ বছর ধরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মশা নিয়ে গবেষণা করছেন। সর্বশেষ জরিপে তার দল দুই ভাবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে, মশার লার্ভা বা শূককীটের ঘনত্ব ও প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি গণনা করে।

লার্ভা পরীক্ষা করতে বিভিন্ন জলাশয় থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি তুলে তাতে লার্ভার সংখ্যা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় সংগৃহীত পানিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ১ হাজার ২৫০-এ।

মশার ওষুধ

প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি যাচাইয়ের পদ্ধতিটিও চমকে দেওয়ার মতো। একজন মানুষের হাঁটু পর্যন্ত পা ও বাহু উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে, তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৮৫০।

অধ্যাপক বাশারের আশঙ্কা, মার্চে এ প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, এক ঘণ্টায় পাঁচটি মশা কামড়াতে এলেই বিশ্বমানে তা বেশি। সেখানে ঢাকায় ৮৫০টি, এটি কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি বিপৎসংকেত।

কীটতত্ববিদ কবিরুল বাশার জাগো নিউজকে বলেন, রাজধানীতে মশার প্রকোপ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে ড্রেন ও নর্দমার পানি জমে থাকে, ফলে সেখানে মশার লার্ভা জন্মানোর উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তার দ্রুত বাড়ে। আবার শীতের পর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়াও মশার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে। এ সময় মশা দ্রুত বংশবিস্তার করে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এছাড়া সম্প্রতি স্থানীয় সরকার কাঠামোর কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা দেখা গেছে। জাতীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যস্ততার কারণে অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের তদারকি কমে যায়। আগে প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর ও মেম্বাররা সরাসরি এসব বিষয় দেখভাল করতেন। তাদের অনুপস্থিতি বা সক্রিয়তার ঘাটতির ফলে মশক নিধনে চেইন অব কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মশার উপদ্রব

মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম

ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ড ও ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা মহানগর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, এ মহানগরে প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ মানুষ বাস করে।

অন্যদিকে, জাতিসংঘের অর্থনৈতিক বা সামাজিকবিষয়ক বিভাগ বলছে, ঢাকার বর্তমান জনসংখ্যা ৩ কোটি ৬৬ লাখ। ওই পরিমাণ মানুষকে মশার কবল থেকে রক্ষার দায়িত্ব ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির। এ দুটি সংস্থা মশা নিধনে সকালে ড্রেন, নালা, ঝিল বা খালে লার্ভিসাইড ও বিকেলে এডাল্টিসাইড প্রয়োগ করে। কিন্তু তারপরও কেন মশা নিয়ন্ত্রণে আসছে না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে মশক নিধন কার্যক্রম তদারকি করতেন কাউন্সিলর ও মেয়ররা। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর তারা সবাই আত্মগোপনে চলে গেছেন। ফলে মাঠ পর্যায়ে জবাবদিহিতার জায়গা নেই। নাগরিকদের ভোগান্তির বিষয়েও কারো কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন না নাগরিকরা। এর মধ্যে সংস্থা দুটিতে মশক নিধনে জনবল সংকট রয়েছে।

তবে গত ২২ ফেব্রুয়ারি ডিএসসিসিতে নতুন প্রশাসক হয়েছেন বিএনপি নেতা আবদুস সালাম। একই দিন ডিএনসিসিতে প্রশাসক হয়েছেন বিএনপির আরেক নেতা শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। তারা ২৪ ফেব্রুয়ারি নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগ দেন এবং করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে মশা নিধনের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।

এর মধ্যে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) ডিএসসিসি প্রশাসক নগর ভবনে এক বৈঠকে ঢাকাকে বাসযোগ্য ও সুন্দর নগরীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে চারটি অগ্রাধিকার কর্মসূচি নির্ধারণ করেছেন। অগ্রাধিকার পাওয়া চারটির মধ্যে একটি মশক নিধন কার্যক্রম।

মশার ওষুধ

২৪ ফেব্রুয়ারি ডিএনসিসি নবনিযুক্ত প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতকে সঙ্গে নিয়ে মিরপুর-২-এ অবস্থিত ডিএনসিসির মশক নিধন ঔষধ সংরক্ষণাগার পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে মশক নিধন ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয় এবং মশক নিয়ন্ত্রণে করপোরেশনের সার্বিক প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেন তারা।

এর দুই দিন পর ২৬ ফেব্রুয়ারি উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টর কমিউনিটি সেন্টারে ডিএনসিসি অঞ্চল-১, ৬, ৭ ও ৮-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা করেন ডিএনসিসির নবনিযুক্ত প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান।

ওই সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রশাসক বলেন, শুধু মশার ওষুধ দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কার্যকরভাবে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য সামাজিক সচেতনতা ও মনিটরিং বৃদ্ধি করতে হবে। এ সময় প্রশাসক মশককর্মীদের সময়মতো ও আন্তরিকভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন।

উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মশার উপদ্রব উত্তরাতে। এখানে লেক, ঝিল, জলাশয় বা ডোবা প্রচুর। এগুলোতে কেউ কখনও মশার ওষুধ ছিটায় না। ফলে সারা বছরই মশার উপদ্রব থাকে। এখন দিনের বেলাতেই বাসায় মশায় কামড়ায়। সন্ধ্যার আগে দরজা-জানালা বন্ধ রাখলেও কোন ফাঁকা দিয়ে ভেতরে মশা ঢুকে তা টেরই পাই না।’

মশার ওষুধ

নগর সবুজায়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ নানান বিষয় নিয়ে কাজ করেন গুলশান সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, মশার উপদ্রব ঢাকার সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার এক অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি। কয়েল, অ্যারোসল, মশারি কোনো কিছুতেই মশার আক্রমণ ঠেকানো যায় না। এ মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণের মধ্যে শ্যামপুর, কদমতলী, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও এলাকায় সবচেয়ে বেশি মশার উপদ্রব। কারণ, ওই এলাকাগুলোতে প্রচুর পরিত্যক্ত ডোবা, নালা রয়েছে।

শ্যামপুরের বাসিন্দা আকরাম হোসেন। তিনি বলেন, শ্যামপুর, কদমতলী ঢাকার নিম্নাঞ্চল। এখানে সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো সেবাই পাওয়া যায় না। মাসে একবারও সিটি করপোরেশনকে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখি না। অথচ মশার কামড়ে ঘরে থাকা যায় না। দিন-রাত বাচ্চাদের ঘরের ভেতর আটকে রাখতে হয়।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান জাগো নিউজকে বলেন, মশা নিধনে আমরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। এ কার্যক্রমে ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যস্থাপনা বিভাগকেও যুক্ত করেছি যাতে কোনো ডোবা, নালায় জমে থাকা ময়লাতে মশা জন্মাতে না পারে। তবে সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে মশক নিধন সম্ভব নয়। এ জন্য জনগনকে (যার জমিতে ডোবা আছে) দায়িত্ব পালন করতে হবে।

এমএমএ/এসএনআর/এমএমএআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।