সাঁইজির টানে ছেঁউড়িয়ায় ভক্তের ঢল


প্রকাশিত: ০৭:৫৮ পিএম, ১২ মার্চ ২০১৭

ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে ভক্তের ঢল নেমেছে। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ স্মরণে দোল উৎসবের দ্বিতীয় দিনে পুণ্য সেবায় শেষ হয়েছে বাউলদের অষ্ট প্রহরের সাধুসংঘ। রোববার ভোরে গোষ্ঠ গানের মধ্য দিয়ে বাউলদের দিনের আচার অনুষ্ঠান শুরু হয়।

স্মরণোৎসবের দ্বিতীয় দিন রোববার সন্ধ্যায় লালন মঞ্চে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক জহির রায়হানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুর রউফ। বিশেষ অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার এস এম মেহেদী হাসান, জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মহসিন, জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম প্রমুখ।

একাডেমি সূত্রে জানা যায়, ভোরে গোষ্ঠ গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে একে একে অনুষ্ঠিত হয় তাদের কার্যকরণ। ভোগগ্রহণের পালা শেষে চলতে থাকে গানবাজনা, তত্ত্ব আলোচনা। দুপুরে পুণ্য সেবার মধ্য দিয়ে শেষ হয় বাউলদের অষ্ট প্রহরের সাধু সংঘ। পুণ্য সেবায় ভাত, মাছ, ডাল ও মিষ্টান্ন খেতে দেয়া হয় বাউলদের।

lalon

শনিবার থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ায় লোক সমাগম কম ছিল। তবে বৃষ্টি না হওয়ায় রোববার দুপুরের পর থেকেই লালন মাজারে ছিল দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। লালন মাজারের আশপাশে ও মরা কালী নদীর তীর ধরে বাউলেরা ছোট ছোট আস্তানা গেড়ে সাঁইজিকে স্মরণ করেছেন তার গাওয়া গান গেয়ে। বাউল-ফকিরদের সঙ্গে সুর মেলাতে ভুল করছেন না ভক্তরাও।

ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে লাখো মানুষ সাঁইজির সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন এ স্মরণোৎসবে। আউল-বাউল, সাধু-বৈষ্ণব আর ফকির-দিওয়ানাদের পদভারে মুখর হয়ে উঠেছে সাঁইজি ধাম। ধামের পাশে বিশাল মাঠের খোলা প্রান্তরে গুরু-শিষ্যের মিলনমেলায় মনের মানুষের সন্ধানে আকুল ভক্তদের চলছে নাচে- গানে দিন-রাত ভাবের খেলা। ভাব আরাধ্যের তীর্থভূমি ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ি, তাই সাঁইজি লালন ফকিরের স্মরণোৎসবে এসে বাউল সাধু গুরুরা অপার সাঁইজেকে স্মরণ করছেন গানে গানে।

আখড়াবাড়ির আঙ্গিনা ছাড়াও খণ্ড খণ্ড আন্তানায় বসেছেন প্রবীণ গুরু ও ভক্ত শিষ্যরা। বাউল আচারের যজ্ঞ পালন ছাড়াও বাউল পথ ও মতের দীক্ষাও নিচ্ছেন অনেকে। স্মরণোৎসব বা দোল উৎসব মানেই বাউল ফকিরদের মহাসম্মেলন।

দোল পূর্ণিমার উৎসবের ব্যাপারে প্রবীণ বাউলরা জানান, লালন জীবিত থাকতে দোল পূর্ণিমার রাতে শিষ্যদের নিয়ে আসর বসাতেন। পাঁচ ঘরে তিনি সাধু সঙ্গ করতেন। তিনি মারা যাবার পর এ ধারা চলে আসছে।

মাজারের খাদেম মোহাম্মদ আলী জানান, এ অনুষ্ঠান চাঁদের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাউলরা চাঁদ দেখে আচার পালন করেন। তবে এসবের মধ্যে অনেক গভীর তত্ত্ব আছে। সেগুলো সবাইকে বলা যাবে না। লালন সাঁইজি জীবিত থাকাকালে ফাল্গুনের শেষে দোল পূর্ণিমা তিথিতে কালী নদীর তীরে শিষ্যদের নিয়ে রাতভর গান-বাজনা ও তত্ত্ব আলোচনা করতেন, যা কালক্রমে পরিণত হয়েছে লালন স্মরণোৎসবে।

দূর-দূরান্ত থেকে সাদা বসনে বাউল সাধকরা এসেছেন দলে দলে একতারা-দোতারা, ঢোল- খোল, বাঁশি, প্রেমজুড়ি, চাকতি, খমক হাতে। ক্ষণে ক্ষণেই খণ্ড খণ্ড মজমা থেকে নৃত্যসঙ্গীতের তালে তালে ছলকে উঠছে যেন উত্তাল ভাববাদী ঢেউ। কেউ শুধু লুঙ্গি পরে নাচছেন, গাইছেন। গলায় বিচিত্র বর্ণ ও আকারের পাথরের মালা। হাতে বিশেষ ধরনের লাঠি ও বাদ্যযন্ত্র। লালন ধামের ভেতর ও বাইরে নিজেদের পছন্দমতো জায়গা করে নিয়ে গান-বাজনা করছেন তারা। বিচিত্র সব বাদ্যযন্ত্রে তুলছেন হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া লালনগীতি। আখড়ার একটি দল থামছে তো অন্যটি জমিয়ে রাখছে চারপাশ। সোমবার তিন দিনব্যাপী এ সাধুর হাট ভাঙবে।

আল-মামুন সাগর/জেএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।