চরাঞ্চলের মছিরনদের এখন সুদিন
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার পশ্চিম দেলুয়াবাড়ি চরের উত্তরপাড়া গ্রামের মছিরন বেগমের স্বামী ও তিন ছেলে-মেয়েকে নিয়ে সংসার। আগে সাংসারিক কাজ ছাড়া কোনো কাজ করতেন না তিনি। ফলে স্বামীর একার রোজগারে সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকত। কিন্তু এখন আর সংসারে অভাব নেই। সুদিন ফিরেছে মছিরন বেগমের সংসারে। ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে। স্বামীর পাশাপাশি নিজেও কৃষিকাজ করেন।
মছিরন বেগমের মতো অনেক নারীই এখন স্বামীর পাশাপাশি কৃষিকাজ করে ভাগ্যের পরিবর্তন এনেছেন। এ কাজে তাদের সহযোগিতা করেছে গাইবান্ধার বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন এসকেএস ফাউন্ডেশনের রিকল প্রকল্প।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারীর নেতৃত্ব বিকাশ, নারীর অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার মাধ্যমে চরাঞ্চলের মানুষদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করাই হচ্ছে এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
মছিরন বেগম বলেন, আগে আমার স্বামী একাই রোজগার করতো। আমি কোনো কাজ করতাম না। যে কারণে সংসারে অভাব লেগেই থাকতো। এখন নিজে কাজ করার ফলে সংসারে আর অভাব নেই। এবার ২৫ কাঠা জমিতে নিজেই ভুট্টার চাষ করে প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় করেছি।
এসকেএস ফাউন্ডেশন কার্যালয় সূত্র জানায়, চরাঞ্চলের মানুষদের আর্থসামাজিক, অর্থনৈতিক, জলবায়ু মোকাবেলাসহ তাদের পাশে থেকে কাজ করতে রিকল প্রকল্পটি ২০১০ সালে ১ সেপ্টেম্বর চালু হয়। প্রকল্পে গাইবান্ধার দুইটি উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের ৩৯টি সংগঠনের মাধ্যমে ৬৪১৫টি পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এসব পরিবারের সদস্যদেরকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, উদ্ধার ও অনুসন্ধান, উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, গাভী প্রতিপালন, অধিকার ও সামাজিক ন্যায় বিচার, দুগ্ধজাত দ্রব্য তৈরিসহ বিভিন্ন বিষয়ে ২৮৩৬ জনকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এছাড়া ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা করা হয় ১০৬ জনকে এবং ৫টি গোসলখানা ও ৩২৪টি পায়খানা নির্মাণ করে দেয়া হয়।
উন্নত জাতের গাভী, ছাগল, ভেড়া, ফুড ব্যাংক, নলকুপ, হ্যান্ড ওয়াশিং ডিভাইস, বন্ধু চুলা, ত্রিপল, পানির ড্রাম, বিতরণ করা হয় ৯৩২ জনকে। আরও রয়েছে ১০টি দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র, ৫টি ঘোড়ার গাড়ি ও একটি মিনি গার্মেন্টস।

প্রকল্পের আওতায় বসতবাড়ি উঁচুকরণ করে দেয়া হয় ১২৪টি পরিবারকে, সংযোগ সড়ক তৈরি ও পুন:সংস্কার করা হয় ৯টি, কাউশেড উঁচুকরণ করা হয় ৪টি, ফলজ ও বনজ গাছেন চারা বিতরণ করা হয় ৬০৮ জনকে। শাক-সবজি ও বিভিন্ন ফসল ফলানোর জন্য মানুষদেরকে সার, বীজ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয়া হয়েছে।
উত্তরপাড়া গ্রামের ফুলিচা বেগম বলেন, আগে আমাদেরকে নদীতে গোসল করতে হতো। সঙ্গে ছোট বাচ্চারাও যেত। পানিতে ডুবে শিশুদের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। আমাদের জন্য নির্মাণ করে দেয়া গোসলখানায় এখন স্বাচ্ছন্দে গোসল করছি। বাচ্চাদের প্রাণহানিও ঘটছে না।
প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরও অনেকেই করছেন সবজি, ঘাষ, মরিচ, ভুট্টাসহ আরও অনেক প্রকার শাকসবজি ও ফসলের চাষ। আগে চরাঞ্চলের অধিকাংশ জমিই পতিত থাকতো। এখন সেসব জমিতে ফসল চাষ করে বাড়তি আয় করছেন চরাঞ্চলের মানুষরা।
রিকল প্রকল্পের দেয়া ফুড ব্যাংকে চাল ও ডাল জমা করে রাখা হয়। একই গ্রামের রফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, বন্যার সময় চরাঞ্চলের মাঠ-ঘাট সব পানিতে তলিয়ে যায়। সে সময় আমাদের হাতে কোনো কাজ থাকেনা। বন্যার সময় দু`বেলা আধপেটা খেয়ে দিন কাটতো। গত বছরের বন্যায় ফুড ব্যাংক থেকে চাল ও ডাল নিয়ে উপকার পেয়েছি।
পশ্চিম দেলুয়াবাড়ি চরের উত্তরপাড়া গ্রামের শাহিনুর বেগম বলেন, গত ৬ বছরে উত্তরপাড়াসহ আশেপাশের কয়েকটি চরে ১২০টি নারী নির্যাতনের ঘটনা, ৪২টি বাল্যবিবাহ, ১৯টি যৌতুক ও ৫টি বহুবিবাহ বন্ধ করা হয়েছে।
রিকল প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর বাহারাম খান বলেন, উন্নয়নের দিক থেকে পিছিয়ে থাকা চরাঞ্চলের মানুষদের সহযোগিতা করে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষেই আমরা কাজ করি এবং আমরা সফল হয়েছি। আমরা এখন দেখছি গৃহস্থালির সেবামূলক কাজ পরিবারের সকলে ভাগাভাগি করার মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
এমএএস/জেআইএম