গামছা বুনে জীবন চলে যাদের
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার আড়ানী পৌরসভার মোমিনপুর, রুস্তমপুর, পাঁচপাড়া ও চকসিংগা মহল্লার তাঁত পল্লীর দরিদ্র নারীরা গামছা বুনে জীবিকা নির্বাহ করছেন। স্বল্প পুঁজি দিয়ে নিজেদের উদ্যোগে গায়ের ঘাম ঝড়িয়ে গামছা তৈরি করছেন তারা। সেই গামছা বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় হাট-বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায়।
উপজেলার মোমিনপুর, রুস্তমপুর, পাঁচপাড়া ও চকসিংগা মহল্লার তাঁত পল্লী ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে গামছা তৈরির তাঁত। বেশিরভাগ পরিবার হতদরিদ্র। এসব পরিবারের নারীরা ব্যস্ত গামছা তৈরিতে। কেউ সুতায় মাড় দিয়ে রং মিশিয়ে চরকার মাধ্যমে সুতা প্রস্তুত করছে। কেউ কাঠ ও বাঁশের তৈরি তাঁতের মেশিনে বুনছেন গামছা। ওই পল্লীতে মূলত গামছা তৈরির কাজটা করেন নারীরা।
পুরুষরা করেন কৃষিসহ অন্যান্য কাজ। এর পাশাপাশি গামছা তৈরিতে নারীদের সহযোগিতা করে থাকেন তারা। গামছা তৈরিতে ব্যস্ত নারীরা জানান, গামছা তৈরিতে ব্যাপক পরিশ্রম করতে হয়। লাভ হয় সামান্য। তারপর বাজারে ঐতিহ্যবাহী তাঁতের গামছার ব্যাপক চাহিদা থাকায় তারা পেশা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গামছা তৈরি ও বিক্রি করছেন।
সুতা ও রং মিলে তাঁতে একটি গামছা তৈরিতে তাদের খরচ হয় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। প্রতিটি গামছা বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১২০ টাকা। একটি গামছায় লাভ থাকে ২০ থেকে ৩০ টাকা। একদিনে একটি তাঁতে চারটি গামছা তৈরি হচ্ছে। সেই হিসেবে প্রতিদিন ৪৫টি তাঁতে তৈরি হচ্ছে, প্রতি সপ্তাহে ১৮০ পিস।
তারা আরও জানান, বর্তমানে সুতা ও রঙের দাম বেড়েছে। এ কারণে গামছা তৈরিতে খরচ বেড়ে গেছে। ২০ গোছার এক বান্ডিল সুতার দাম এখন এক হাজার ৮০০ টাকা। কিছুদিন আগে ওই সুতার দাম ছিল এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। স্বল্প পুঁজি দিয়ে গামছা বোনা চলছে। গামছা বিক্রির সামান্য লাভের টাকা দিয়ে নারীরা সংসারের ব্যয় নির্বাহের পাশাপাশি ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ বহন করছেন তারা।
তাদের দাবি, সরকার সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করলে তারা আরও ভালোভাবে গামছা তৈরি ও তা বিক্রি করে আয়-রোজগার বাড়াতে পারবেন। তাঁত পল্লীর নারীদের একটি বিশেষ সুবিধা হচ্ছে স্থানীয় বাজারে গামছা বিক্রি হয়। এখনো বাজারে তাঁতের গামছার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখানে তৈরি গামছা স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে পারলে তাঁত পল্লীর নারীদের গামছা উৎপাদন আরও বাড়বে।
অনেক স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা ও দরিদ্র নারীরা তাঁতের কাজ করে সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন-যাপন করছেন। মোমিনপুর গ্রামের তাঁতী খালেদা বেগম জানান, ‘আমার বয়স প্রায় ৬০ বছর। ১৩ বছর বয়সে বিয়ের পর থেকেই আমি তাঁতের কাজ করি। আমাদের এখানে প্রায় সব বাড়ির নারীরা তাঁতের কাজ করে। সংসারের কাজ সেরে অবসর সময়ে বসে না থেকে এই কাজ করায় সংসারে বাড়তি রোজগার হয়। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনাসহ সংসার চালাতে পারি ভালোভাবে।
ওই এলাকার আরেক নারী তাঁতী রাশেদা বেগম জানান, বিয়ের পর থেকে আমি তাঁতের কাজ শুরু করি। অনেক ইচ্ছা ছিল তাঁতের শাড়ি, থ্রি-পিসসহ সব ধরনের কাপড় তৈরি করব। কিন্তু টাকা-পয়সার অভাবে আমার ইচ্ছা শুধু ইচ্ছাই থেকে গেল। শুধু গামছা তৈরি করে আমি আমার সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করেছি, বড় মেয়ে রুপালি ও মেজ মেয়ে শেফালিকে বিয়েও দিয়েছি। ছোট মেয়ে শেলী আর ছেলে সবুজের জন্য কিছু টাকা জমিয়েছি। এখন মেয়েটাকে বিয়ে ও ছেলেটাকে একটা কাজে লাগিয়ে দিতে পারলেই আমার সব আশা পূরণ হবে।
অন্যান্য শিল্পের মধ্যে তাঁত শিল্প একটি। আর এই শিল্পকে শক্ত হাতে ধরে রেখেছেন ওই এলাকার নারীরা। তবে অর্থের সঙ্কট থাকায় নারীরা শত চেষ্টা করেও তাঁত শিল্পকে বেশিদূর নিয়ে যেতে পারছেন না। সরকারি ও বেসরকারিভাবে সহযোগিতা পেলে তাদের তৈরি কাপড় দেশের বিভিন্ন জায়গাসহ দেশের বাইরেও রফতানি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন ওই এলাকার নারীরা।
আড়ানী পৌর মেয়র নজরুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, তাঁত একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প। একে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ্যের পাশাপাশি বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত। মোমিনপুর, রুস্তমপুর, পাঁচপাড়া ও চকসিংগা তাঁত পল্লীর উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সহজ শর্তে ঋণদানের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবো। পাশাপাশি পৌরসভার পক্ষ থেকে এসব পরিবারের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে বলে জানান তিনি।
এমজেড/আরআই