স্থল সীমান্ত চুক্তি : ১৬২ ছিটমহলে আনন্দের বন্যা


প্রকাশিত: ০৪:০৩ এএম, ০৬ মে ২০১৫

নানা জটিলতা আর জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার ভারতের মন্ত্রীসভা স্থল সীমান্ত চুক্তি (সংবিধান সংশোধন) বিলটি অনুমোদন করেছে। বুধবার তা রাজ্যসভায় পেশ করার কথা রয়েছে। দীর্ঘ দিনের প্রত্যাশিত বিলটি অনুমোদনের খবর শুনে বাংলাদেশ ও ভারতের ১৬২টি ছিটমহলের মানুষ আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছে। ভাসছে আনন্দের বন্যায়।

তারা আশা করছেন, এর মাধ্যমে তাদের দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দী জীবনের অবসান ঘটবে। নাগরিক অধিকার ফিরে পাবার পাশাপাশি উন্নত আধুনিক জীবনের সুযোগ পাবেন তারা। মিলবে রাষ্ট্রিয় পরিচয়। বংশ পরম্পরায় এমন স্বপ্নই দেখে আসছে ছিটমহলবাসীরা।

মঙ্গলবার কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহল দাশিয়ার ছড়ায় গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বাড়ির আঙিনায়, টংঘরে, বাজারে, ক্ষেত-খামার, পথে-ঘাটে মানুষ সীমান্ত চুক্তি বিলটি অনুমোদনের বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে। তাদের মধ্যে অনেককে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তারা কাজকর্ম ফেলে আনন্দে মেতে উঠেছেন। আনন্দে আলিঙ্গন করছে একে অপরকে। বিতরণ করা হচ্ছে মিষ্টি।

ছিটের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বলেন, ‘এবার আমরা খাঁচার বন্দী জীবন থেকে মুক্তি পাব। আমাদের আনন্দ প্রকাশের কোন ভাষা নেই।`

আনন্দের অশ্রু চোখে কৃষক সুরত আলী বলেন, ‘ আমরা অতি তাড়াতাড়ি বাংলাদেশের নাগরিক হতে যাচ্ছি, এর চেয়ে ভাল খবর আর কি হতে পারে’।

স্কুল ছাত্রী আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ‘এখন স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকতে পারব। বুক উঁচু করে পরিচয় দিতে পারবো। মিথ্যে পরিচয় দিয়ে স্কুল-কলেজ বা হাসপাতালে যেতে হবে না।`

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিমিয় সমন্বয় কমিটি ভারত ইউনিটের সহ-সাধারণ সম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্ত জানান, বিলটিতে আসাম রাজ্যকে অর্ন্তভূক্ত করা হবে কিনা তা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ছিল। কারণ আসাম বিজিপি’র পক্ষ থেকে সীমান্ত চুক্তি থেকে আসামের ছিটমহলগুলো বাদ দেয়ার চাপ দেয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এর প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেন রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ। সীমান্ত চুক্তি থেকে আসামকে বাদ দেয়া হলে কংগ্রেস বিলে সমর্থন দিবে না বলে হুশিয়ার করে দেয় তিনি। এরই পরিপেক্ষিতে সোমবার রাতে বিজিবি’র সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহার বাসভবনে জরুরি বৈঠক বসে। সেখানে আসাম বিজিবি’র সভাপতি সিদ্ধার্থ ভট্রাচার্যসহ দলের সাংসদরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আসামকে রেখেই বিলটি পাসের সিদ্ধান্ত হয়। পরে মঙ্গলবার মন্ত্রী সভায় বিলটি পাস করা হয়।

বিলটি পূর্ণাঙ্গরূপে মন্ত্রীসভায় অনুমোদন করায় সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, আমরা আশা করছি দ্রুততম সময়ে বিলের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ৬৮বছরের বঞ্চণার অবসান করবে ভারত সরকার।

বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি বাংলাদেশ ইউনিট সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘বিলটি পাশের ব্যাপারে ছিটমহলবাসীর আর কোন সংশয় নেই। তবে কোন জটিলতা সৃষ্টি হলে ছিটমহলবাসীরা আবারও আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর নজর কাড়বে’।

ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি বাংলাদেশ ইউনিটের সভাপতি মইনুল হক জানান, মুজিব-ইন্দ্রিরার ’৭৪-এর স্থল সীমান্ত চুক্তিটি পুরোপুরি বাস্তবায়নে ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের মধ্যে প্রটোকল সই হয়। তাতে অবশ্য ছিটমহল বিনিময়ের কোন সুস্পষ্ট সময়সীমা ছিলনা।

ছিটমহল ও অপদখলীয় ভূমি বিনিময় এবং সাড়ে ৬ কিলোমিটার সীমান্ত চিহ্নিত করাই ছিল এর লক্ষ্য। ভারতের তৎকালীন সরকারী দল কংগ্রেস রাজ্যসভার অধিবেশনে স্থলসীমান্ত চুক্তি বিলটি কয়েক দফায় উত্থাপনের চেষ্টা করে কিন্তু বিরোধী দল বিজেপি, আসাম গণপরিষদ ও পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বেঁকে বসায় বিলটি উত্থাপন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পার্লামেন্টের শীতকালীন অধিবেশনে ভারতের সংবিধান সংশোধন করে এই চুক্তি বাস্তবায়নের কথা শোনা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। পরে মমতা ছিটমহল বিনিময়ের ব্যাপারে তার আপত্তি তুলে নেন। বাংলাদেশ সফরের সময়ও তিনি এ অনাপত্তির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। অবশেষে ভারতের মন্ত্রী পরিষদ সীমান্ত বিলটি অনুমোদন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো।

এসএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।