অজানা রোগে একই পরিবারের ৮ জনের মৃত্যু
মোসলেম উদ্দিনের বয়স এখন ৫৫ বছর। ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থই ছিলেন। তারপর হঠাৎ করেই এক অজ্ঞাতরোগে আক্রান্ত হতে থাকেন। হাত-পাসহ সারা শরীর ক্রমেই বেঁকে যেতে থাকে। কথাও অস্পষ্ট হয়ে যায়। ধীরে ধীরে তা প্রকট হতে থাকে। এরপর সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধীতে পরিণত হন। এখন নানামুখী অসুবিধাসহ শরীরের ব্যাথায় দুর্বিসহ জীবন যাপন করতে হচ্ছে। একইভাবে তার বাবারও মৃত্যু হয়েছে।
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার প্রত্যন্ত একটি গ্রাম কৃষ্ণশাইলে একই পরিবারে বংশাক্রানুক্রমে এই অজানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যে ৮ মারা গেছেন। আক্রান্ত হয়ে ৯ জন দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন। ঢাকাসহ অন্যান্য চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা করে কেউই সুস্থ হননি। এতে পরিবারের বাঁকি সুস্থ সদস্যরাও আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্কে রয়েছেন।
ঈমান আলীর আদরের একমাত্র মেয়ে রহিমন খাতুন। বিয়ে দিয়ে জামাই-মেয়েকে বাড়িতেই রেখে দেন। প্রায় ৭২ বছর বয়সে ঈমান আলীর হাত-পা ধীরে ধীরে পঙ্গু হয়ে মারা যান। একই ভাবে রহিমনও ৬২ বছর বয়সে আক্রান্ত হয়ে ৬৭ বছর বয়সে মারা গেছেন। রহিমনের চার ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে তিন ছেলে ও এক মেয়ে ইত্যেমধ্যে এই জ্বিনগত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এই সাত সন্তানের নয় সন্তানও আক্রান্ত হয়েছেন এই রোগে।
রাজশাহী, ঢাকাসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়েছে। চিকিৎসায় হাজার হাজার টাকা খরচ হলেও এখন পর্যন্ত কেউ ভালো হয়নি।
নিহতরা হলেন, ঈমান আলী (৭২), রহিমন খাতুন (৬৭), রহিমন খাতুন তিন ছেলে আমির (৬২), সমির (৫৮) সিরাজুল ইসলাম (৫২) এবং এক মেয়ে নেকজান বিবি (৫০)। নেকজান বিবির ছেলে আজিজুল ইসলাম (৩৭), সিরাজুল ইসলামের মেয়ে তারামন বিবি (২৫)। এছাড়া আক্রান্তরা হলেন, লাইলী, মজিদুল, শাবান, শরিফুন বিবি, শরীফুল, স্বপ্নাসহ ৯ জন।

চিকিৎসকদের ভাষায় এই রোগে নাম Huntington’s Disease বা জ্বিনগত সমস্যা। চিকিৎসক সূত্রে জানা গেছে, এ রোগের প্রতিষেধক এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি। এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার আগ মুহূর্তে তার চোখের পাতা, হাত-পা-এর আঙ্গুল লাফাতে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। এ রোগে আক্রান্তরা বছর’দুয়েকের মধ্যে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে যান। কিছুই করতে পারেন না।
আক্রান্ত মোসলেম উদ্দিনের স্ত্রী চেন বানু বলেন, স্বামীকে দৈনন্দিন পরিচর্যা এবং দেখাশুনা করতে বিড়ম্বিত জীবনযাপন করতে হচ্ছে পরিবারের লোকজনদের। এছাড়া আর্থিক দূরবস্থায় অনাহারে-অর্ধহারে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। এই রোগে আক্রান্ত এই বংশের লোকদের সমাজে চলতে নানান সমস্যায় পড়তে হয়। এলাকার সবাই এখন আতঙ্কে থাকে। প্রতিবেশীরা আমাদের সঙ্গে তেমন সম্পর্ক রাখে না।
রোগে আক্রান্ত শরিফুন বিবি জানান, দুই বছর আগেও ভালো ছিলেন তিনি। এই রোগে আক্রান্ত হওয়ায় এখন তার চলাফেরা করতে সমস্যা হয়। শরীরে ব্যাথায় দুর্বিসহ জীবন যাপন করতে হচ্ছে। পরিবারের অন্যদের হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। কিন্তু এখনো কোনো চিকিৎসা উদ্ভাবন করা হয়নি। যদি এ রোগ চিহ্নিত হয় তাহলে সেরে ওঠা সম্ভব।
নিয়ামতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য পরিদর্শক ডা. নুরতাজ হোসেন, এই রোগের প্রথম সন্ধ্যান লাভ করেন স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ। তিনি এসব আক্রান্তদের রোগ শনাক্ত এবং চিকিৎসার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন বিভিন্ন সময়। তাদের নানাভাবে সহযোগিতাও করেছেন তিনি।
সিভিল সার্জন ডা. রওশন আরা খানম জানান, চিকিৎসকদের ভাষায় এই রোগটিকে Huntington’s Disease (জ্বিনগত) বা বংশগত রোগ বলা হয়। অনেক হাসপাতালে চিকিৎসা করা হলেও এখন পর্যন্ত এই রোগের প্রতিশোধক তৈরি না হওয়ায় এই রোগে আক্রান্তদের ভালো হবার সম্ভবনা নেই বলে জানান এই চিকিৎসক।
তিনি আরো বলেন, নিজেদের (বংশের) মধ্যে তাদের বিয়ে হওয়ায় এই রোগ হয়েছে। বিশেষজ্ঞ মতে অন্য বংশের সঙ্গে বিয়ে হলে ধীরে ধীরে তাদের এই রোগ ভালো হবার সম্ভবনা হয়েছে।
আব্বাস আলী/এফএ/এমএস