জেলেদের চাল গেল দুর্যোগ মোকাবিলায়
রাঙামাটির কাপ্তাই লেকে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। এতে এর ওপর নির্ভরশীল ২১ হাজারের অধিক জেলের দুর্বিষহ জীবন কাটছে। নেই খাদ্য সহায়তা। মাছ ধরা বন্ধের এ তিন মাসে জেলে প্রতি মাসে ২০ কেজি করে চাল দেয়ার কথা থাকলেও দেয়া হয়নি এক কেজিও। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়া এসব জেলে পরিবারের দিন কাটছে অর্ধাহারে অনাহারে।
প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে এবার ঘটে যাওয়া ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ সহায়তার চাপে জেলেদের জন্য এখনও ভিজিএফ চাল বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। বরাদ্দ এলেই বিতরণ করা হবে।
জানা যায়, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর এ মৌসুমে এ লেকে তিন মাসের জন্য মাছ আহরণ নিষিদ্ধ থাকে। এ সময় ভিজিএফ কার্ডের বিপরীতে পরিবার প্রতি মাসে ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করে সরকার। কিন্তু এ বছর এরই মধ্যে বন্ধের প্রায় পুরোটা সময় পার হয়ে গেলেও আজও খাদ্য সহায়তা পাননি জেলেরা। লেকে মাছ আহরণ নিষিদ্ধ চলছে ১ মে থেকে। যা চলতি মাস শেষে উঠে যাবে।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী কাপ্তাই লেকের আয়তন ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ এ কৃত্রিম জলরাশি বাংলাদেশের প্রধান মৎস্য উৎপাদন ক্ষেত্র। এতে মাছ আহরণের ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য মৎস্যজীবী। নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২১ হাজার ১৫৯ জন। এছাড়া পুকুর, ক্রিকসহ বিভিন্ন জলাশয়ে মৎস্যচাষির সংখ্যা ৩ হাজার ৪২১ জন।
প্রতি বছর লেকে মাছ শিকার বন্ধের সময় কর্মহীন হয়ে বেকার হয়ে পড়েন এসব জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ। খাদ্য সহায়তা হিসেবে মাসে ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হলেও এ বছর এখনও তা মেলেনি।
রাঙামাটি শহরের চেঙ্গিমুখ এলাকার নতুন এবং পুরাতন জালিয়াপাড়া ঘুরে দেখা যায়, পরিবার পরিজন নিয়ে দুর্বিষহ জীবন পার করছেন জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ।
তারা জানান, প্রায় প্রতিটি জেলে পরিবারে দিন কাটছে আধা বেলা আধা পেটা খেয়ে। কোনো কোনো সময় কারও কারও না খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। অনেকে দিনমজুর, পরিবহণ ও নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করে অভাব অনটনের মধ্যে মানবেতর দিন পার করছেন।
নতুন জালিয়াপাড়ার নারী মৎস্যজীবী ডেইজি রাণী দে বলেন, তারা কেবল নির্ভরশীল কাপ্তাই লেকে মাছ ধরা এবং কেনাবেচার ওপর। এছাড়া আর অন্য কোনো পেশা বা আয়ের উৎস নেই। প্রতি বছর লেকে মাছ ধরা বন্ধ হয়ে গেলে সম্পূর্ণ বেকার হয়ে থাকতে হয়। এ সময়ে মাসে ২০ কেজি করে ভিজিএফের চাল দেয় সরকার। কিন্তু এ বছর এখনও তা পাইনি। অনেক কষ্টে আছি। এ পর্যন্ত কেউ আমাদের খবরও নেয়নি।

একই পাড়ার জেলে বিদু মোহন, মানিক জলদাশ, সুরিত জলদাশ বলেন, প্রতি বছর মাছ ধরা বন্ধকালীন সরকার থেকে আমাদেরকে তিন মাসে ৬০ কেজি চাল বিতরণের কথা। কিন্তু গত বছর শুধু দুই মাসের ৪০ কেজি চাল পেয়েছিলাম। আর এ বছর তো এক কেজিও পাইনি। অভাব অনটনের সংসারে আমাদের ছেলেমেয়দের পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে গেছে। যেখানে দু’বেলা ভাত জোটে না সেখানে লেখাপড়া কী দিয়ে হবে।
রাঙামাটি মৎস্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক উদয়ন বড়ুয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, জেলেদের ভিজিএফ চালের জন্য জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেছি। তারা বলছেন বরাদ্দ এলেই দেয়া হবে। আর কিছু দিন পর মাছ ধরা শুরু হবে। কিন্তু জেলেরা এখন দিশেহারা।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিএফডিসি (বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশন) কাপ্তাই লেকে মাছ আহরণের ওপর বিপুল রাজস্ব আদায় করলেও জেলেদের জন্য কিছুই করছে না। তাদেরকে জেলেদের সহায়তায় দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয়া দরকার।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক প্রকাশ কান্তি চৌধুরী বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার কারণে এখানকার জেলেদের জন্য ভিজিএফের চাল বরাদ্দ পেতে দেরি হচ্ছে। বরাদ্দ এলেই বিতরণ করা হবে।
উল্লেখ্য, কাপ্তাই পানিবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষে ১৯৬০ সালে কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলি নদীর ওপর দিয়ে বাঁধ নির্মিত হয়। এর ফলে সৃষ্টি হয় এ কাপ্তাই লেক। লেক সৃষ্টির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি মৎস্য উৎপাদন, যাতায়াত, পর্যটনসহ বিভিন্ন সুবিধা গড়ে ওটে।
সুশীল প্রসাদ চাকমা/এফএ/এমএস