মার্চ ৬
ইয়াহিয়ার ভাষণ, উত্তাল বাংলা ৭ মার্চের অপেক্ষায়
প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ দুপুরে পূর্ব বাংলার আন্দোলনরত জনগণকে ‘দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দিয়ে বেতারে ভাষণ দেন। এতে সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ভাষণে পরিস্থিতির অবনতির জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে দায়ী করায় রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
প্রেসিডেন্টের ভাষণের পরপরই শেখ মুজিবের বাসভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাখার ওয়ার্কিং কমিটির জরুরি রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
ভাষণের পর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। অন্যদিকে, রাওয়ালপিন্ডিতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্টের ভাষণকে স্বাগত জানান।
লাহোরে কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা এয়ার মার্শাল (অব.) নূর খান এক সাক্ষাৎকারে বলেন, শেখ মুজিবের দেশ শাসনের বৈধ অধিকার রয়েছে এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের সব বাধা অবিলম্বে দূর করা উচিত। প্রেসিডেন্টের ভাষণে শেখ মুজিবকে দোষারোপ করায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
হরতালে জনতার ঢল
ষষ্ঠ দিনের মতো সর্বস্তরের মানুষ ঢাকার রাস্তায় নেমে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন করেন। হরতাল শেষে শেখ মুজিবের নির্দেশে বেলা আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক এবং যেসব বেসরকারি অফিসে আগে বেতন দেওয়া হয়নি, সেসব অফিস খোলা রাখা হয়।
সহিংসতা ও প্রাণহানি
ঢাকায় বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় কারাগারের গেট ভেঙে ৩৪১ জন কয়েদি পালিয়ে যান। পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে সাতজন নিহত ও ৩০ জন আহত হন।
ঢাকার রাজপথে স্বাধিকার আন্দোলনের লাঠি-মিছিল/ছবি: সংগৃহীত
রাজশাহীতে মিছিলকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে অন্তত একজন নিহত হন। খুলনায় সংঘর্ষ ও গুলিতে ১৮ জন নিহত এবং ৮৬ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করন।
এদিকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম জানান, ভারতের ওপর দিয়ে পাকিস্তানের বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
৭ মার্চের অপেক্ষায় দেশ
৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিব কী ঘোষণা দেবেন- তা জানতে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করতে থাকেন বাংলার মুক্তিকামী জনতা। ছাত্রলীগ ও ডাকসু নেতারা এক বিবৃতিতে ৭ মার্চের ভাষণ দেশের সব বেতার কেন্দ্র থেকে সরাসরি সম্প্রচারের দাবি জানান।
রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সহিংসতা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তখন সবার দৃষ্টি স্থির থাকে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক সমাবেশের দিকে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ১৯৭১ সালে প্রকাশিত সংবাদপত্র
এমএএস/একিউএফ