কাঠের ওপর বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য
বাঁশপট্টি নিবাসী নারায়ণচন্দ্র মিস্ত্রি। শিক্ষাগত যোগ্যতা মাত্র ৮ম শ্রেণি পাস। ৯ম শ্রেণিতে উঠলেও এসএসসির রেজিস্ট্রেশনের টাকা জোগার করতে না পারায় তার ভাগ্যে আর পড়াশোনা জোটেনি। নারায়ণ মিস্ত্রির পিতা নগেন মিস্ত্রিও পেশায় ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। তিনি কোনো কারুকাজ না জানলেও ওই সময় নৌকা ও ছোট ঘর তুলতে বেশ পারদর্শী ছিলেন। বাধ্য হয়েই পিতার সঙ্গে কাঠমিস্ত্রির কাজে বের হন নারায়ণ। কাঠের ওপর কারুকাজে তার দৃষ্টি সুক্ষ্ম থাকায় তিনি আর নৌকা ও ঘর তোলার সীমানা পাড়ি দিয়ে হয়ে ওঠেন আধুনিক মিস্ত্রি।
তিনি তৈরি করছেন সোফা সেটসহ কাঠের ওপর নানা কারুকাজের ভাস্কর্য। তিনি দৈনিক ৬শ টাকা বেতনে কাজ করে থাকেন। সংসারে তার স্ত্রী, উচ্চশিক্ষায় অধ্যায়নকারী মেয়ে, সদ্য উচ্চমাধ্যমিক অতিক্রমকারী ছেলে ও মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনারত ছোট মেয়ে রয়েছেন। এদের সার্বিক খরচ জোগাতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মিস্ত্রি হিসেবে দিনমজুরের কাজ করেন নারায়ণ মিস্ত্রি। রাতে প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে কাঠের ওপর বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য তৈরিতে কাজ করেন তিনি।
শুধু বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে ভাস্কর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি আরও কাঠের ভাস্কর্য তৈরি করছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা ও প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, প্রাকৃতিক প্রেমী কবি জীবনান্দ দাশ, কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঝালকাঠির জীবন্ত কিংবদন্তি বর্তমান সরকারের শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, ঐতিহ্যবাহী ডাকপিয়ন, গ্রামীণ চিত্রের ওপরেও ভাস্কর্য তৈরি করছেন।
সোমবার দুপুরে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এমনটাই বর্ণনা দেন নারায়ণ চন্দ্র মিস্ত্রি। তিনি জানান, কাঠমিস্ত্রির কাজ করার সময় বিভিন্ন ভাস্কর্য দেখে উদ্বুদ্ধ হই। চট্টগ্রাম থেকে চান্দি কাঠ অর্ডার দিয়ে কিনে এনে তার ওপর কারুকাজ করছি। দিনে তো সময় পাই না, তাই রাতে প্রতিদিন ২ ঘণ্টা করে কাজ করি। একেকটি ভাস্কর্য তৈরি করতে এক সপ্তাহ সময় লাগে। ৩৬ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি এবং ১৬ ইঞ্চি বাই ১৪ ইঞ্চি, এ দুটি আকারে ভাস্কর্য তৈরি করি। এতে ছবির আকারভেদে ৪শ টাকা থেকে সাড়ে ৮শ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। বিক্রি করি ৬শ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত।

তিনি আরও জানান, মাস চারেক পূর্বে ঝালকাঠির উন্নয় মেলায় স্টলে অংশগ্রহণ করে পুরস্কারও অর্জন করেছেন। নারায়ণ মিস্ত্রি শুধু কাঠের ভাস্কর্য তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন না, একজন শিক্ষানুরাগীও। ছোট বেলায় তিনি টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে না পারায় চার লক্ষাধিক টাকা মূল্যের দুই হাজারের বেশি বই নিয়ে একটি ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছেন। যার নামও দিয়েছেন তার নিজ নামে “নারায়ণ মিস্ত্রি গ্রন্থাগার”।
নারায়ণ চন্দ্র বলেন, ছোট বেলায় টাকার অভাবে পড়াশোনা করতে না পারায় নিজ উদ্যোগে লাইব্রেরি স্থাপন করেছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বই সংগ্রহ করেছি। দিনাজপুর শহর থেকেও প্রায় ১শ কিলোমিটার দূরে কান্তজির মন্দিরে গিয়েও বই এনেছি। এখানে পাঠকদের জন্য বসে বই পড়ার সুব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও হোম ডেলিভারি রয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে বাইসাইকেলে করে পাঠকদের বাসায় বই পৌঁছে দেয়া এবং পূর্বে দেয়া বইগুলো ফেরত এনে সাজিয়ে রাখতে দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করি। এরপরে কাঠের ভাস্কর্য তৈরির কাজে বসি।
তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রথমে পরীক্ষামূলক একটি ভাস্কর্য তৈরি করি। তাতে সফল হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে শুরু করি। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী অর্ডার করলে আমি ভাস্কর্য তৈরি করে সাপ্লাই দেই।
তবে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ছবিটার কাজ শুরু করেছি বেশ কিছু দিন পূর্বে কিন্তু বরিশালে বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় স্তব্দ হয়েছিলাম। তাই কাজও থেমেছিল। এখন কাজটা শেষ পর্যায়ে শুধু বঙ্গবন্ধুর বাম গালে তিলক লাগানোর কাজ করছি।

অভিযোগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সম্প্রতি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে নামধারী বেশকিছু সংগঠনকে সহায়তা দেয়া হলেও আমার লাইব্রেরির জন্য কোনো সহযোগিতা পাইনি।
ঝালকাঠি পৌর প্যানেল মেয়র মাহবুবুজ্জামান স্বপন বলেন, বাঁশপট্টির নারায়ণ মিস্ত্রির কারুকাজ অনেক দৃষ্টিনন্দন। তিনি যেসব ভাস্কর্যের কাজ করছেন এতে খ্যাতনামা ভাস্কর্য শিল্পী হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হক বলেন, নারায়ণ মিস্ত্রি নামের একজন কারুশিল্পী রয়েছেন। যিনি অতি সুক্ষ্মভাবে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীসহ খ্যাতনামা ব্যক্তিদের ভাস্কর্য তৈরিতে পারদর্শী। তিনি তার মেধা শুধু কারুশিল্প ও ভাস্কর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে রয়েছে লাইব্রেরিও। যার মাধ্যমে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছেন। তাকে সরকারিভাবে বিশেষ অনুদান পাইয়ে দেবার ব্যবস্থা করা হবে। আমি তার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনা করি।
মো. আতিকুর রহমান/বিএ