কিশোরের হাত-পা বেঁধে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন
নওগাঁয় শরিফুল ইসলাম নামের ১৫ বছরের এক কিশোরকে চুরির অপবাদ দিয়ে পায়ের আঙুলে সুঁই ঢুকিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে প্রায় ১৬ ঘণ্টা ধরে মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বর নির্যাতন চালানো হয়েছে।
কিশোর শরিফুল ইসলামের বাড়ি নওগাঁর রানীনগর উপজেলার কালিগ্রাম ইউনিয়নের কালিগ্রামের মুন্সিপাড়ায়। প্রবাসী জামাল উদ্দিন আকন্দের ছেলে সে।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও কিশোরকে উদ্ধার না করেই থানায় ফিরে আসে। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসী পুলিশের এ বিষয়টিকে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুক্রবার দুপুরে শরিফুল ইসলাম বাড়িতে ছিল। প্রতিবেশী আব্দুল খালেক কাজ আছে বলে শরিফুলকে তার বাড়িতে ডেকে নিয়ে যায়। শরিফুলকে তার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়। এরপর হাজি আক্কাস আলী, তার ছেলে জিয়ারুল ও টিপুকে বাড়িতে ডেকে নেয় খালেক। খালেক টাকা চুরির অপবাদ দিয়ে শরিফুলের বাম হাতে লাঠি দিয়ে আঘাত করে।
এরপর গলায় গামছা পেঁচিয়ে ৪-৫ মিনিট ধরে টানাহেচড়া করে এবং শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করে। শরিফুলের হাত বেঁধে চারজন মিলে লাঠি দিয়ে নির্যাতন করে। চিৎকার করায় কৌশলে শরিফুলকে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলের কাছে নিয়ে যায়। এরপর সেখানে কয়েক দফা নির্যাতন চালানো হয়।
প্রতিবেশীরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তাদেরকে মারপিট করার জন্য নিষেধ করে। এ বিষয়টি তার মা আয়েশাকে জানানো হলে ছুটে যান সেখানে। তাদের হাত পা ধরেও কোনো কাজ হয়নি। এরপর থানা পুলিশে সংবাদ দেন মা আয়েশা। তখন রাত ৮টা। পুলিশের এসআই শফিকুর রহমান ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর শরিফুলকে উদ্ধার না করে রহস্যজনকভাবে থানায় ফিরে আসেন। রাতে কিশোরকে খালেকের বাড়িতে রাখা হয় এবং আবারও নির্যাতন চালানো হয়।
শনিবার সকালে মা আয়েশা থানায় আসেন এবং পুলিশের কাছে কান্নাকাটি করেন। সারাদিন গেলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। অবশেষে রাত ৮টার দিকে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পুনরায় গিয়ে কিশোর শরিফুলকে উদ্ধার করে এবং রানীননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
এ সময় ঘটনার মূল হোতা আব্দুল খালেককে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ওই কিশোরকে রোববার সকালে নওগাঁ সদর হাসপাতালে অর্থোপেডিক বিভাগে ভর্তি করানো হয়।
শরিফুলের মা আয়েশা বলেন, মারপিটের কারণে আমার ছেলে রক্ত বমি করছে। তাদেরকে আমি হাত-পা ধরেছি ছেলেকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। তারপরও আবার নির্যাতন চালিয়েছে। প্রথম দিনে পুলিশকে জানানো হলেও পুলিশ আমার ছেলেকে উদ্ধার না করে চলে আসে। আমি এর বিচার চাই।
কালিগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বাবলু বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে শরিফুলের হাত বাঁধা অবস্থায় দেখি। তার শরীরে নির্যাতনের চিহ্নি দেখা যাচ্ছে। তাদেরকে বলার পর তারা হাতের বাঁধ খুলে দেয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় সেখানে পুলিশ গিয়েছিল এবং ফিরে এসেছে। আমি নিজে ডাক্তার নিয়ে এসে তার চিকিৎসা করিয়েছি।
থানা পুলিশের এসআই (উপ-পরিদর্শক) শফিকুর রহমান বলেন, ওই এলাকায় একজন আসামিকে ধরতে গিয়েছিলাম। বিষয়টি জানার পর ওসি স্যারকে জানিয়েছি। তবে ঘটনাস্থলে শুক্রবার আমি যায়নি। পরের দিন শনিবার কিশোরের মাকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে উদ্ধার করে নিয়ে আসি।
রানীনগর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত আব্দুল খালেককে শনিবার গ্রেফতার করা হয়েছে। ছেলের মা আয়েশা বাদী হয়ে শিশু নির্যাতন আইনে আব্দুল খালেককে প্রধান আসামি করে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। রোববার তাকে আদালতের মাধ্যমে নওগাঁ জেল হাজতে পাঠানো হয়। অসুস্থ কিশোর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
আব্বাস আলী/এএম/আরআইপি