ঈদেও পাহাড়ের পর্যটনকেন্দ্রগুলো ফাঁকা
সবুজ পাহাড়ের নান্দনিক সৌন্দর্য আর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাহাড়ি ঝর্ণা যে কাউকে মুগ্ধ করে। পর্যটকের আনাগোনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে গড়ে উঠেছে নতুন পর্যটনকেন্দ্র।
আর পর্যটন হয়ে উঠেছে পার্বত্য অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত। আধুনিক হোটেল-মোটেলের পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষও পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায় জড়িয়েছে।
ঈদ এলেই পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে থাকে উপচেপড়া ভিড়। পর্যটক আসলেই প্রাণ পায় পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। কিন্তু ভরা মৌসুমেও আশানুরুপ পর্যটকের দেখা মিলছে না বলে জানিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বান্দরবানের নীলাচল, নীলগীড়ির মেঘ, শৈলপ্রপাতে ঝর্ণা, পাহাড়ের উঁচুতে স্বর্ণের প্রলেপ খচিত নান্দনিক মন্দির আকর্ষণ করে পর্যটকদের।

কিন্তু চলতি বছরে পাহাড়ধসের ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলার ব্যাপক প্রাণহানি, ভারি বৃষ্টিতে ব্যাহত যোগাযোগ ব্যবস্থা আর সারাদেশের বন্যার প্রভাব পর্যটন ব্যবসায়ের উপরে প্রভাব পড়েছে।
এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত পরিবহন খরচ, হোটেলগুলোতে অত্যাধিক খাওয়ার খরচ, আবাসিক হোটেলগুলোতে বেশি ভাড়া, অবসর সময়ে বাড়তি বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায় দিন দিন পর্যটকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
বান্দরবানের সবচেয়ে বেশি পর্যটকের আনাগোনা দেখা যায়, শহরতলিতে থাকা হোটেল হিলভিউ এবং হোটেল হিলটনের। হোটেলগুলোতে তেমন বুকিং নেই। হোটেল হিলভিউ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্বপন বড়ুয়া বলেন, হোটেলে ২০ শতাংশের কম বুকিং রয়েছে।

হোটেল হিলটনের ব্যবস্থাপক রোমিও বলেন, আগের মতো পর্যটকের দেখা মিলছে না। ২৫০ জন হোটেলের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন হোটেলে এই ঈদে ৩ তারিখ মাত্র ৫ টা সিটের বুকিং আছে।
তারা অভিযোগ করে বলেন, আগের মতো এখানে পর্যটকরা আসার আগ্রহ দেখায় না। কারণ এখানে একজন পর্যটকের জন্য পরিবহন খরচ এবং হোটেলের খাওয়ার খরচ অনেক বেশি। একজন ঘুরতে আসা পর্যটকের কাছে যা বহন করা খুব কষ্টকর। তাই এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সুনজর দেয়া উচিত।
এদিকে, শনিবার বিকেলে নীলাচল পর্যটনকেন্দ্রে দেখা যায়, গত বছরের ন্যায় এবছর নীলাচল পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকের ভিড় নেই। দেখা যায়নি গাড়ির জটলাও। বিকেলে যেসব পর্যটক এসেছেন এদের বেশির ভাগই বান্দরবানের জেলার পাশের উপজেলা থেকে। বসার স্থানগুলো ছিল অনেকটা ফাঁকা।
ঢাকার সাভার থেকে নীলাচলে পর্যটন কেন্দ্রে বেড়াতে আসা পর্যটক সাইফুল আলম বলেন, পাহাড়ে পর্যটনকেন্দ্রেগুলো অনেক সুন্দর। কিন্তু এখানে ভ্রমণব্যয় অনেক বেশি। গাড়ি ভাড়া, খাওয়ার খরচ অনেক বেশি।

বান্দরবান হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম বলেন, বান্দরবানে ৬০টিরও অধিক আবাসিক হোটেল-মোটেল রয়েছে। হোটেলগুলোতে পর্যটকের ধারণক্ষমতা আছে ৫ হাজার। গত বছরেও হোটেলগুলোতে ছিল উপচেপড়া পর্যটকের ভিড়। কিন্তু এখন ভরা মৌসুমেও হোটেলগুলোতে ভিড় দেখা যায় না। গত ঈদুল ফিতরের আগে পাহাড়ধসের ঘটনা এবং পরে সারাদেশের বন্যার প্রভাব পড়েছে পর্যটন ব্যবসায়। এছাড়া এবার ঈদের ছুটি না থাকায় পর্যটক কম হওয়ার আরেকটি কারণ বলেও জানান তিনি।
পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকের ভিড়ের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, আশে পাশের জেলাগুলো থেকে পর্যটকরা এসে ভিড় করে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে। তারা সকালে এসে বিকেলে ফিরে না গিয়ে রাতে থাকলে পর্যটনের নাকাল অবস্থা কিছুটা কেটে যেতে পারে।
নীলাচল পর্যটনকেন্দ্রের টিকেট বিক্রেতা মোরশেদুর রহমান বলেন, ২০১৭ সালের ঈদুল ফিতরের দিন নীলাচল পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটক এসেছিল ২ হাজার ৬২৭ জন। ঈদের দ্বিতীয় দিন এসেছিল ২ হাজার ৬৮৮জন। কিন্তু পর্যটকের এই আগমন গত বছরের তুলনায় অনেক কম। আজ সারাদিনে মাত্র ১৭৪টি টিকেট বিক্রি করা হয়েছে।
এছাড়া চাঁদের গাড়ি চালক মো. বাদশাহ বলেন, গত বছরের ঈদের ২দিন আগেও পর্যটক ছিল। কিন্তু সে পরিমাণ পর্যটকের দেখা মিলছে না। তবে ঈদের পরের দিন কিছু পর্যটক হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসন থেকে ভাড়ার তালিকা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। তাই বাড়তি ভাড়া আদায় করার মতো সুযোগ নেই।
বান্দরবানের পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় বলেছেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সব ব্যবস্থা নেয়া আছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সাদা পোশাকধারী পুলিশের সঙ্গে সঙ্গে টুরিস্ট পুলিশও যুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে, বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক বলেন, পর্যটনের উপরেই এখানের অধিবাসীরা জীবিকা নির্বাহ করে। গত ঈদুল ফিতরে কাঙ্ক্ষিত পর্যটক পায়নি। পাহাড়ধসের একটা ভীতি ছিল। তবে পাহাড়ধসের কোনো চিহ্ন এখন নেই। রাস্তাঘাট সবগুলোই ঠিক করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবহনের চালকরা যাতে পর্যটকদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করেন সে বিষয়ে পরিবহন মালিকদের যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য বলা হয়েছে।
সৈকত দাশ/এএম/পিআর