এক যুগ ধরে ব্রিজের নিচে বসবাস নারী ইউপি মেম্বারের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি হবিগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৯:৪৮ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | আপডেট: ১০:০২ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭
এক যুগ ধরে ব্রিজের নিচে বসবাস নারী ইউপি মেম্বারের

হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের একটি ব্রিজের নিচে দীর্ঘ প্রায় এক যুগ ধরে বসবাস করছেন এক নারী ইউপি মেম্বার। এখানে থেকেই তিনি জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠেছেন। বছরের পর বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করছেন সাধারণ মানুষের জন্য।

গত নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ীও হয়েছেন। করেছেন অসংখ্য মানুষের সমস্যার সমাধান। অন্যের জন্য কাজ করে গেলেও নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়নি এখনও। কি শীত, কি বর্ষা। ব্রিজের নিচেই থাকছেন তিনি। তার দুর্দশা দেখে উপজেলা প্রশাসন ১২ শতাংশ ভূমি বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু তাতে বিপত্তি ঘটিয়েছে গুটিকয়েক প্রভাবশালী। তাদের অপতৎপরতার কারণে মাসের পর মাস গড়িয়ে গেলেও সামান্য এ জায়গাটুকু বুঝিয়ে দেয়া যাচ্ছে না তাকে।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাজিনা সারোয়ার জানান, জায়গাটি রেজিস্ট্রি করে দেয়ার পর ৪টি অভিযোগ আসে। কেউ বলেন এটি শ্মশানের জমি, কেউবা আবার নিজেদের জমি দাবি করেন। অভিযোগগুলো তদন্তের জন্য পূর্বের অ্যাসিল্যান্ডকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তিনি বদলি হয়ে গেছেন। কিন্তু রিপোর্ট দিয়ে যাননি। ফলে একটু সমস্যা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমি চাচ্ছি জায়টি বুঝে পাওয়ার পর তিনি ধরে রাখুক। এ জায়গাটি নিয়ে যেন তার কোনো ধরনের পেরেশানি করতে না হয়। এ কারণে একেবারে পরিচ্ছন্ন করে তাকে বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছি। যদি এ জায়গা নিয়ে সমস্যা হয় তবে অন্য কোথাও হলেও তাকে জায়গা করে দেয়া হবে।

habijang

ভূমিহীন ইউপি সদস্য রহিমা বেগম জানান, সরকার থেকে ১২ শতাংশ জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এটি রেজিস্ট্রি করে দেয়া হলেও জায়গাটি তিনি চেনেনও না। শুধু শোনেছেন।

ইউপি সদস্য রহিমা বেগমের ছেলে ফুলকাছ মিয়া জানান, তার মাকে যে জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেটি সাবেক চেয়ারম্যানের লোকদের বাড়ির কাছে হওয়ায় তারা এটিকে নিজেদের সম্পত্তি দাবি করে অভিযোগ দিয়েছে। সাবেক ইউপি মেম্বার মনির মিয়া, তার ছেলে নূর উদ্দিন, ভাতিজা এমার মিয়া, আবুল কাশেম, আবু বকরসহ কয়েকজন তাদের নিজের জমি দাবি করেছে। আবার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান দিলাওর হোসেন দাবি করেছেন এটি শ্মশানের জমি। প্রকৃতপক্ষে এটি সরকারি জমি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান দিলাওর হোসেন জানান, বাস্তবেও এটি শ্মশানের জায়গা। কাগজপত্রেও তা-ই আছে। রেকর্ডও আছে।

এলাকাবাসী জানান, রহিমা বেগম সংরক্ষিত আসনের ইউপি সদস্য নির্বাচিত হয়েও ভূমিহীনের তালিকা থেকে নাম কাটাতে পারেননি। এ অভাব কখনই থামাতে পারেনি রহিমা বেগমকে। নিজের শত অসুবিধা ফেলে সবার আগে ছুটে যান এলাকাবাসীর সুখে দুঃখে। এর প্রতিদানও পেয়েছেন গত ইউপি নির্বাচনে। তফসিল ঘোষণার পর পরই তিনি কোমর বেঁধে নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমে পড়েন।

গত বছরের গত ২৮ মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৩ জন প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং মাইক প্রতীক নিয়ে অপর দুই প্রার্থীর চেয়ে প্রায় ১৮শ ভোট বেশি পেয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন ৫০ বছর বয়স্ক রহিমা বেগম। তিনি জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার আউশকান্দি ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামের মকদ্দুছ মিয়ার স্ত্রী। তার ২ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। অসুস্থ স্বামী ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে দিশেহারা হয়ে পড়েন রহিমা বেগম। দীর্ঘদিন বিয়ের ঘটক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। আর মাসে ২/১টি বিয়ে পড়াতে পারলেও নুন আন্তে পান্তা ফুরায় রহিমার। ঘটকালির সুবাধে এলাকার মানুষের সঙ্গে তার সু-সম্পর্ক গড়ে উঠে। এলাকাবাসীর পরামর্শেই তিনি নির্বাচনে অংশ নেন। আর বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিতও হন। কয়েকমাস আগে তার পুনর্বাসনে তৎপর হয়ে উঠে উপজেলা প্রশাসন। ভূমিহীন হিসেবে রহিমাকে আউশকান্দি এলাকায় ১২ শতাংশ খাস জমি রেজিস্ট্রি করে দেয়া হয়। সরকারি ভূমি বরাদ্দ দেয়ায় খুশি এলাকাবাসীও। রহিমা বেগমের দারিদ্রতার কথা ভেবে সরকারি উদ্যোগে বাড়ি নির্মাণের অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।

একটি সূত্র জানিয়েছে, রহিমা মেম্বারকে ঘর নির্মাণ করে দেয়ার জন্য অনেক প্রবাসী আর্থিক সহায়তা করেছেন। কিন্তু তা জানেন না রহিমা বেগম নিজেও। এনিয়েও বেশ আলোচনা হচ্ছে।

সৈয়দ এখলাছুর রহমান খোকন/এমএএস/আইআই