দোকানদারি না করলে মা-ছেলের পেটে ভাত জুটবে না

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ০৭:১৯ পিএম, ১৩ অক্টোবর ২০১৭
দোকানদারি না করলে মা-ছেলের পেটে ভাত জুটবে না

‘চতুর্থ শ্রেণিতে আমার রোল নম্বর ছিল সাত। পঞ্চম শ্রেণিতে তিন। এখন আমার অন্য সব বন্ধুরা স্কুলে যেতে পারলেও আমি যেতে পারছি না। কেননা স্কুলে গেলে দোকানদারি করতে পারব না। আর দোকানদারি না করলে আমাদের মা-ছেলের পেটে ভাত জুটবে না। গেল অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় মাত্র ১৮০ টাকার জন্য আমি পরীক্ষা দিতে পারিনি।’

কথাগুলো বলছিল গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার নাকাই ইউনিয়নের মেঘারচর পশ্চিমপাড়া গ্রামের সাগর প্রধান (১১) নামে এক শিশু। সে পাশ্ববর্তী পলাশবাড়ী উপজেলার পবনাপুর ইউনিয়নের ফকিরহাট আল্লাহর দরগা ইসলামিয়া দ্বি-মুখী দাখিল মাদরাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।

ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সাগর দোকানে বসে আছে। ক্রেতা নেই। কিছুক্ষণ পর একজন এসে জিজ্ঞেস করল চাল আছে? সাগর উত্তর দেয়- না নেই। দোকানের তাকগুলোর অনেকটাই ফাঁকা। তার ঘরে দুইটি চৌকি। নেই চেয়ার টেবিলসহ কোনো আসবাবপত্র। হাঁড়ি-পাতিল রাখা রয়েছে মাটিতে।

সাগরের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সাগর যখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে তখন তার বাবা ছায়েদ আলী অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যান। আর মা মালেকা বেগম গৃহিণী। চার ভাই এক বোনের মধ্যে সাগর সবার ছোট। বড় ভাই-বোনদের বিয়ে হয়েছে। সাত শতক জমিতে তার তিন ভাইয়ের আলাদা আলাদা টিনশেড ঘর।

সাগরের বাবা মারা যাওয়ার পর সাগর বাড়ির সামনে একটি দোকান দিয়েছে। দোকানে সে বিস্কুট, চানাচুর, চিপস, শ্যাম্পু, ব্রাশ, কলম, চিনি, তেল, ডাল, লবণ ও শিশুদের শুকনো খাবার বিক্রি করে । সব মিলে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার পণ্যসামগ্রী রয়েছে তার দোকানে। আর এসব পণ্য বিক্রি করে প্রতিদিন লাভ হয় ৪০ থেকে ৫০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে মা-ছেলের।

gaibanda

অপরদিকে দোকান চালাতে গিয়ে বিদ্যালয়ে যেতে পারছে না সাগর। দীর্ঘদিন থেকে সে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত রয়েছে। মাত্র ১৮০ টাকার অভাবে সে গেল অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। পড়ালেখা না করায় অনেকদূর পিছিয়ে পড়েছে সাগর। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে সাগরের শিক্ষাজীবন এখন বন্ধ হবার পথে।

সাগর বলে, আমার পড়ালেখা করার ইচ্ছা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। এখন যদি আমি বিদ্যালয়ে যাই। তাহলে দোকান বন্ধ থাকে। আর দোকান বন্ধ থাকলে সেদিন আয় কম হয়। এমন অনেক দিন গেছে সকালে না খেয়ে বিদ্যালয়ে যেতে হয়েছে। আবার রাতে ভাত রান্না করে পানি দিয়ে (পান্তা) মরিচ-পেঁয়াজ দিয়ে খেতে হয়েছে।

মালেকা বেগম বলেন, সাগরের বাবা মারা যাওয়ার পর আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। এখন আমি এই ছেলেটাকে নিয়ে কী করব। কী খাবো। সে সময় খেয়ে না খেয়ে দিন কেটেছে আমাদের মা-ছেলের। সবকিছুই কিনে খেতে হয়। পরে টাকা ধার করে সাগরকে একটা দোকান করে দেই। সেই দোকানের সামান্য আয়ে এখন কষ্ট করে সংসার চলছে।

তিনি বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ওঠার পর সে দুই-তিন মাস সে বিদ্যালয়ে গিয়েছিল। পরে দোকানদারি করতে গিয়ে তাকে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিতে হয়। বর্তমানে সাগরের শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। আমি চাই আমার ছেলেটা পড়ালেখা করুক।

সাগরের প্রতিবেশি আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সাগর খুব ভালো ছেলে। গ্রামে সকলের কাছে সে অত্যন্ত প্রিয়। তার পড়াশোনার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। আগে দেখতাম দোকানে বসেই সে বই নিয়ে পড়তো। কিন্তু এখন আর সেটা দেখছি না। পরে শুনলাম সে স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে।

মেঘারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) আবদুল গোফফার প্রধান জাগো নিউজকে বলেন, সাগর খুব মেধাবী ছাত্র। চতুর্থ শ্রেণিতে তার রোল নম্বর ছিল সাত আর পঞ্চম শ্রেণিতে ছিল তিন। এমন মেধাবী ছাত্রের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়ানো দরকার। তা না হলে সংসারের হাল ধরতে গিয়ে সাগরের শিক্ষাজীবন পিছিয়ে পড়বে।

ফকিরহাট আল্লাহর দরগা ইসলামিয়া দ্বি-মুখী দাখিল মাদরাসার সহকারী শিক্ষক মো. রাখু মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, সাগর পড়ালেখায় খুব ভালো। সাগরের বাবা না থাকায় এই ছোট্ট বয়সে সাগরকে সংসারের বোঝা টানতে হচ্ছে। তাদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে পারলে সাগর আবার বিদ্যালয়ে আসতে পারবে। আমি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাগরের আগামী পরীক্ষার ফি না নেয়ার ব্যাপারে কথা বলবো।

রওশন আলম পাপুল/আরএআর/আইআই