পিরোজপুরে বসেছে নয়নাভিরাম ভাসমান নৌকার হাট


প্রকাশিত: ০৪:২৮ এএম, ০২ জুলাই ২০১৫

গ্রীষ্মের তাপদগ্ধ প্রকৃতিকে সজল বষর্ণে সিক্ত করে দিয়ে সগৌরবে প্রকৃতিতে এসেছে বর্ষা। তাই কবি বর্ষা ঋতুতে মুগ্ধ হয়ে স্বকন্ঠেই উচ্চারণ করেছেন `বর্ষা আমি, গ্রীষ্মের প্রদাহ শেষ করি মায়ার কাজল চোখে মমতার বর্মপুটভরি। এখন খাল-বিল টই টম্বুর বর্ষার পানিতে। আর বর্ষা ঋতুকে কেন্দ্র করে জেলা ও উপজেলাসহ বিল ও চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কৃষি কাজকে উপলক্ষ করে পিরোজপুরের নেছারাবাদে (স্বরূপকাঠি) বসেছে বিখ্যাত ভাসমান নৌকার হাট।

সরেজমিনে নৌকার হাট ঘুরে মনে হল এ যেন এক নৌকার মেলা। নৌকা ক্রেতা, বিক্রেতা ও হাট দেখা কৌতহূলি হাজারো মানুষের ভীড় দেখে মনে হল কালের গর্ভে বাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য যেন নেছারাবাদে সবই আছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই ব্যবসা এলাকার মানুষের কাছে একটি অন্যতম ঐতিহ্য। যা শুধু বেঁচা-কেনার জন্যই নয়, এই অঞ্চলের মানুষের কাছে একটি পর্যটনের বিষয়ও বটে। নয়নাভিরাম নৌকার পসরা চোখে না দেখলে মনেই হবে না জলে-ডাঙ্গায় এক সঙ্গে এত নৌকার সমারোহ ঘটতেপারে।



পিরোজপুরের কাঠ ব্যবসাখ্যাত নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার ১০ ইউনিয়নের ১৩টি গ্রামের প্রায় দেড় সহস্রাধিক পরিবার বংশ পরম্পরায় এ পেশায় জীবিকা নির্বাহ করে আসছে বলে জানান, উপজেলা ও পাশ্ববর্তী উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নৌকার হাটে আসা শতাধিক ক্রেতা, বিক্রেতারা।

পিরোজপুর জেলা ও বরিশাল বিভাগের বিল অঞ্চলের মানুষের উল্লিখিত কাজে শত বছর ধরে নেছারাবাদের সন্ধ্যা নদীর শাখা খালের আটঘরের জলের ডাঙ্গায় চলে আসছে এ নয়নাভিরাম নৌকার হাট। সভ্যতার বিকাশে  ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্ট্রিমারের রাজত্ব থাকলেও প্রতি বছর বর্ষা ঋতুতে এ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াত ও যাবতীয় ছোটখাট ব্যবসা-বাণিজ্যে নৌকার কদর বাড়ে। তাইতো উপজেলার এই ভাসমান নৌকার হাটে বিভাগের দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা, বিক্রেতা ও নৌকার হাট দেখার উৎসুক জনতার ভীড়ে আটঘরে সরগম হয়ে উঠেছে দৃষ্টিনন্দিত নৌ সাম্রাজ্য। সপ্তাহে প্রতি শুক্রবার আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নের আটঘরের খালে ও রাস্তার প্রায় এক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসে দক্ষিণবঙ্গের বৃহত্তম এ নৌকার হাট।

ঝালকাঠীর পাষন্ডা গ্রাম থেকে আসা নৌকা মিস্ত্রি সঞ্জয় গরামী (৩৫) জানান, ৫ বছর ধরে সে এ নৌকার হাটে আসছে। আজকের হাটে সে ৭টি নৌকা এনেছে। বেচা-বিক্রি খুব ভাল বলে মনে হয়েছে তার কাছে। তিনি আরো জানান, নৌকার আকার ও প্রকারভেদে ৭ শত  টাকা থেকে শুরু করে ৫ হাজার টাকার নৌকা ওঠে এ হাটে। আমড়া, আম, রেইনট্রি, কড়াই ও চাম্বল কাঠ দিয়ে তৈরি হাটে আসা সিংহ ভাগ নৌকা।



হাটে আসা একাধিক নৌকা বিক্রেতা ও স্থানীয়দের কাছে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে এ উপজেলার দেশ বরণ্য কুড়িআনার আপেল খ্যাত পেয়ারা, আমড়া, চাই দিয়ে মাছ ধরা এবং গো-খাদ্য সংগ্রহে নৌকার কদর বেশি থাকে।

স্থানীয় নৌকা ব্যবসায়ী ফরিদ মিয়া জানান, এ অঞ্চলের মানুষেরা নৌকায় করে খালের মধ্য ছোট খাট ব্যবসা বানিজ্যে করে থাকে। সে কারণে পেনিস নৌকার চাহিদা একটু বেশি।

নৌকা মিস্ত্রী আলিম বলেন, একটি পেনিস নৌকা তৈরিতে তার এক থেকে দেড় দিন সময় লাগে। কাঠ ও মজুরি মিলিয়ে তার খরচ পড়ে ৬শ থেকে ৭শত টাকা। যা তিনি ৪শ থেকে ৫শত  টাকা লাভে বিক্রি করেন।

উপজেলার চামী গ্রাম থেকে আসা নৌকা ব্যবসায়ী মো. জহিরুল জানান, ৩০ বছর পর্যন্ত সে এই নৌকার হাটে আসছে। সে জানায়, প্রতি জ্যৈষ্ঠ থেকে বাংলা আশ্বিন মাস পর্যন্ত এ হাটে নৌকা কেনা-বেচার ধুম থাকে। তবে আষাঢ় ও শ্রাবণে বেচা-বিক্রিতে মহাব্যস্ত থাকে হাটের নৌকা বিক্রেতারা। চরাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত, ফসল তোলা, শাপলা তোলা, চাই পাতা, গরুর খাদ্য সংগ্রহসহ নানা কাজে এখানকার বিক্রিত নৌকা ব্যবহৃত হয়ে থাকে ।



ঝালকাঠির বিনয়কাঠি থেকে আসা নৌকা ক্রেতা মো. সাইদুল বলে উঠলেন, এ বছর হাটে নৌকার দাম বেশি। গত বছর যে নৌকা ২ হাজার ৫ শত টাকায় বিক্রি হয়েছে সে নৌকা এবার ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫ শত  টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

বলদিয়া থেকে নৌকার হাটে আসা নৌকা মিস্ত্রী সাদিক জানান, ১৯৭৪ সাল থেকে সে নিজ হাতে নৌকা বানিয়ে একসাথে ২৫ থেকে ৩০টি নৌকা নিয়ে হাটে আসে। তিনি জানান, একটি ১২ হাতি নৌকা তৈরিতে এক জনের সময় লাগে ৩ থেকে ৪ দিন। যার মজুরি ও কাঠ মিলিয়ে খরচ পড়ে ২ হাজার ২শত থেকে ২ হাজার ৫শত টাকা। যা ৮শ থেকে ১ হাজার টাকা লাভে সে বিক্রি করে থাকে। সাদিক আরো বলেন, এ বছর নৌকা তৈরিতে কাঠপাটসহ সব কিছুর মজুরি বৃদ্ধিতে নৌকার দাম বেশি বলে তিনি দাবি করেন।

নৌকা ব্যবসায়ী ও হাটের স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর এ মৌসুমে বরিশাল জেলাসহ দক্ষিণাঞ্চলের দূর-দূরান্ত থেকে সহস্রাধিক নৌকা ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা বড় বড় ট্রলার ও নসিমনযোগে এসে এক সাথে ১৫ থেকে ২০টি নৌকা কিনে নিয়ে যায়। তারা জানান, প্রতি হাটে এই খালে তিন থেকে আড়াই হাজারেরও বেশি নৌকা বিক্রির উদ্দেশে পসরা সাজিয়ে থাকেন ব্যাবসায়ীরা।

দুবির হাট থেকে আসা বৈঠা ব্যবসায়ী মো. মহসিন বলেন, নৌকার বিক্রির সময় সঙ্গে বৈঠা দেওয়া হয় না। তাই আলাদা করে নৌকা কেনার পরে বৈঠা কিনতে হয় বৈঠা ব্যবসায়ীদের কাছে। ৭৫ টাকা থেকে শুরু করে আকার ও কাঠ অনুযায়ী ৩ শত টাকায় বিক্রি হয় একেকটি বৈঠা।

হাটে আসা একাধিক নৌকা মিস্ত্রী ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, উপজেলার স্বরূপকাঠি এবং মিয়ারহাট ও ইন্দ্রেরহাট থেকে তারা সহজলভ্যে কাঠ কিনে হাটে আসা এসকল নৌকা তৈরি করে থাকেন। উপজেলার শেকেরহাট, দলহার, আতা, কুড়িয়ানা, বেঙ্গুলি ও ডুবিরহাট, একতা, পঞ্চবেকিরসহ এখানকার মানুষেরা নৌকা তৈরিতে পারদর্শী।



হাটে আসা নৌকা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, হাটের ইজারাদাররা তাদের নিকট ১০ থেকে ১২ টাকা খাজনা নিচ্ছে। যা অন্যান্য বারের তুলনায় বেশি। এছাড়া হাটে ব্যবসায়ীদের বসার জন্য কোন ব্যবস্থা করেনা ইজারাদাররা। তাই রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে তাদের ব্যবসা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, নৌকা তৈরিতে কাঠ সঙ্কট, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি ও গ্রাম অঞ্চলে নৌকার ব্যবহার কমে যাওয়ার কারণে নৌকা কারিগররা আগের মত নৌকা তৈরির আগ্রহ ক্রমশ হারিয়ে ফেলছেন। অন্যদিকে ইজারাদারদের অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসার সম্পূর্ণ মুনাফা ভোগ করতে পারছেন না কারিগর ও বিক্রেতারা। এই অঞ্চলের নৌকা ব্যবসায়ীদের দাবি, তাদের যুগ যুগ ধরে চলে আসা ঐতিহ্যবাহী নৌ-হাট সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে নেওয়া হোক সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ।

নৌকার হাটের ইজারাদার মনোজ কুমার জানান, এখানে কোন অতিরিক্ত খাজনা নেওয়া হয় না। আর যেহেতু হাটটি বসে থাকে রাস্তাসহ খালের ভিতরে তাই এখানে বসার কোন ব্যাবস্থা করা যাচ্ছে না।

এসএস/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।