বাড়ি নেয়ার আগেই গলে যাচ্ছে প্রণোদনার সার

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নেত্রকোনা
প্রকাশিত: ০২:০৩ পিএম, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৭

সরকারি হিসাবে আগাম বন্যায় ৯৯ ভাগ কৃষকের বছরের একমাত্র ফসলের ক্ষতি হওয়ার পর সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে কৃষকদের সহায়তা করা হচ্ছে। ঘরে এক মুঠো ফসল না থাকলেও স্ত্রী সন্তান আর সংসার নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে ব্যস্ত চাষিরা। এরই মধ্যে হালের গবাদি পশুসহ সহায়-সম্বল বিক্রি করেছেন অনেকে। তবুও ঘুরে দাঁড়াতে পারছেন না।

হাওরাঞ্চলের এ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ত্রাণ বিতরণ ও ভর্তুকিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। উৎকোচের বিনিময়ে কিংবা আত্মীয়য়করণে কৃষি কার্ডসহ ত্রাণ সামগ্রীতে ঠকছেন প্রকৃত চাষিরা।

এদিকে, বোরো ধানের কৃত্রিম বীজ সংকটের কারণে সময়মতো বীজ বপন করতে পারছেন না প্রান্তিক চাষিরা। এছাড়া সরকার নির্ধারিত বোরো ধানের ডিলারের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চড়া দামে বীজ বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি স্বীকার করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসন।

হাওরাঞ্চলে একদিকে চরম খাদ্য সংকট অন্যদিকে কৃষি উপকরণ কিনতে চড়া সুদেও ঋণ পাচ্ছেন না কৃষকরা। তবুও শেষ সম্বল বিক্রি করে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে ব্যস্ত হচ্ছেন তারা।

আগাম বন্যায় বছরের একমাত্র ফসলহানির পর এ ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের মানুষকে দেখতে চলতি বছরের ১৮ মে খালিয়াজুরীতে যান প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবরা।

ওই সময়ে সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী উপজেলার মোট ক্ষতিগ্রস্ত ২৪ হাজার ৯৪৫ কৃষকের মধ্যে ১৯ হাজার কৃষককে প্রান্তিক কৃষক ঘোষণা করে। ক্ষতিগ্রস্তদের কৃষি ভর্তুকির উদ্যোগ নিলেও তাতে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ স্থানীয়দের।

অসাধু সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের জন্য প্রান্তিক চাষিরা সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ সুযোগ নিয়ে টাকার বিনিময়ে দেয়া হচ্ছে ভর্তুকির কার্ড।

খালিয়াজুরীর উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের ইছাপুর গ্রামের কৃষক যতীন্দ্র সরকার জাগো নিউজকে বলেন, ৬৪ কাটা জমিতে বোরো ধান লাগিয়েছিলাম। বন্যায় এক মুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারিনি। সহায়-সম্বল সব বিক্রি করে বেঁচে আছি। এখন আর সংসার চলাতে পারছি না। সরকারি সহযোগিতা আসলেও কোনো ত্রাণের কার্ড পাই না। পাইনি কৃষি ভুর্তুকির কার্ডও।

এ নিয়ে নেত্রকোনা জেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য জেলা কৃষকলীগের সভাপতি কেশব রঞ্জন সরকার জাগো নিউজকে বলেন, জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে কৃষকদের কাছ থেকে জেনেছি ডিলাররা অতিরিক্ত দামে বীজ বিক্রি করছেন। জেলা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক বিলাশ চন্দ্র পাল এসব অনিয়ম জেনেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এছাড়া উপ-পরিচালকের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়েও কোনো সুফল পাইনি।

Picture-Netrokona-(1)

খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল বারেক জাগো নিউজকে বলেন, প্রণোদনার যে সার আমাদের দেয়া হচ্ছে তা নিম্নমানের। তা দিয়ে কোনোভাবেই সঠিক উপকার পাওয়া সম্ভব না। নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব সার গলে যাচ্ছে। কোনো কাজে আসছে না।

হাওর বাঁচা আন্দোলনের সভাপতি স্বাগত সরকার শুভ জাগো নিউজকে বলেন, সরকারি তদারকি বাড়ালে কৃষকরা বঞ্চিত হবেন না। মনিটরিং বাড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সঠিকভাবে ভুর্তুকি বিতরণের দাবিও জানান তিনি।

এদিকে, খালিয়াজুরী সদর ইউনিয়নের সার-বীজ ডিলার এবং ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি যতীন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে কৃত্রিম বীজ সংকট দেখিয়ে অতিরিক্ত দামে বীজ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের পর স্থানীয় প্রশাসন দাঁড়িয়ে থেকে বীজ বিক্রি করেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন সীলা বীজ ডিলার যতীন্দ্র সরকার।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লোকমান হাকিম জাগো নিউজকে বলেন, মেন্দিপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য চন্দর সরকারের বিরুদ্ধে কৃষি ভর্তুকি কার্ড বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছি। তাকে ডেকে সর্তক করে দেয়া হয়েছে। এরপর এ ধরনের অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি অফিসে কৃষি ভর্তুকি নিতে আসা চাকুয়া ইউনিয়নের চাকুয়া গ্রামের কৃষক লতিফ মিয়া বলেন, এ সার দিয়ে পানি পড়ে। এ সার ভালো না। বার বার বললেও কৃষি কর্মকর্তারা শুনছেন না।

তবে সার নিম্নমানের ও তা মেয়াদোত্তীর্ণ নয় দাবি করে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, সারের মান নিয়ে কোনো ভয় নেই। মান ভালো আছে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের আঠারো হাজার প্রান্তিক চাষিকে ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

কালো বাজারে বীজ বিক্রি অভিযোগ রয়েছে স্বীকার করে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক ড. মুশফিকুর রহমান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা বাস্তবায়নে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না।

কামাল হোসাইন/এএম/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।